তৃণমূলের লোকসভার দলনেতা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রশ্নের মুখে পড়ে সংসদে জোর ধাক্কা খেল মোদি সরকার। দেশের শিশু পুষ্টি ও পোষণ অভিযান (পোষণ ২.০) বাস্তবায়নের সামগ্রিক চিত্র স্পষ্টভাবে তুলে ধরতে ব্যর্থ হল কেন্দ্র। ব্যাখ্যা দেওয়া তো দূরের কথা। শুধুই তথ্যের জাগলারি, মানুষকে বিভ্রান্ত করার প্রয়াস। নিজেদের ব্যর্থতা আড়াল করার জন্য মরিয়া প্রয়াস মোদি সরকারের।
লোকসভায় নারী ও শিশু বিকাশ মন্ত্রকের প্রতিমন্ত্রী সাবিত্রী ঠাকুরের দেওয়া লিখিত উত্তর বিশ্লেষণ করলে দেখা যাচ্ছে, সাংসদ অভিষেক যে সুনির্দিষ্ট তথ্য জানতে চেয়েছিলেন, তার বড় অংশেরই সদুত্তর এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় মূলত চারটি বিষয়ে কেন্দ্রের কাছে হিসেব চান— ২০২০-২১ অর্থবর্ষ থেকে ‘পোষণ অভিযান’-এর অধীনে বরাদ্দ ও প্রকৃত খরচের হিসাব, রিয়েল-টাইম মনিটরিংয়ের জন্য কার্যকর প্রযুক্তিগত যন্ত্রপাতির বিবরণ, রাজ্যভিত্তিক শিশু অপুষ্টি হ্রাসের চিত্র এবং পিছিয়ে পড়া রাজ্যগুলির জন্য গৃহীত সংশোধনমূলক পদক্ষেপ। কিন্তু কেন্দ্রের দেওয়া উত্তরে স্পষ্ট কোনও রাজ্যওয়াড়ি খরচের হিসাব বা অপুষ্টির হ্রাস-বৃদ্ধির তুলনামূলক আঞ্চলিক তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। মন্ত্রকের দেওয়া তথ্য বলছে, ‘মিশন সক্ষম অঙ্গনওয়াড়ি এবং পোষণ ২.০’- এর আওতায় ২০২০-২১ অর্থবর্ষে ১৬,১০৫.৭৮ কোটি টাকা, ২০২১-২২ অর্থবর্ষে ১৮,৩৬৮.০১ কোটি টাকা, ২০২২-২৩ অর্থবর্ষে ১৯,৮৪৯.৮২ কোটি টাকা এবং ২০২৩-২৪ অর্থবর্ষে ২১,৭৪১.১৭ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়। তবে ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষে এই বরাদ্দের পরিমাণ কমে দাঁড়ায় ২০,৯০৪.৮৩ কোটি টাকায় এবং ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষের জন্য বরাদ্দ দেখাচ্ছে ১৬,৭৭৭.৩৭ কোটি টাকা। সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় বরাদ্দকৃত অর্থের পাশাপাশি ব্যবহৃত অর্থ বা খরচের হিসাব জানতে চাইলেও কেন্দ্র কেবল অর্থ বরাদ্দের অঙ্ক দেখিয়েই দায় সেরেছে, প্রকৃত খরচের কোনও খতিয়ান সংসদে পেশ করেনি।
একইভাবে, রাজ্যওয়ারি শিশু অপুষ্টির চিত্র জানতে চাওয়া হলে কেন্দ্র কোনও সুনির্দিষ্ট রাজ্যভিত্তিক পরিসংখ্যান দেওয়ার পরিবর্তে এনএফএইচএস-১ থেকে এনএফএইচএস-৬ পর্যন্ত সামগ্রিক জাতীয় গড় তুলে ধরেছে। এনএফএইচএস-৬ (২০২৩-২৪) অনুযায়ী দেশে শিশুদের খর্বকায়তা ২৯.৩ শতাংশ, কৃশতা ১৯.০ শতাংশ এবং কম ওজন ৩১.৮ শতাংশে নেমে এসেছে বলে দাবি করা হলেও, কোন রাজ্যে এই পরিস্থিতি চরম আকার ধারণ করেছে কিংবা কোন রাজ্য ভাল ফল করেছে, তা এড়িয়ে গিয়ে সাধারণ একটি পোর্টালের লিঙ্ক উল্লেখ করা হয়েছে। পিছিয়ে থাকা রাজ্যগুলির জন্য বিশেষ কী পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে, সে-বিষয়ে নীতিগত কথার ব্যাখ্যা মিললেও নির্দিষ্ট কোনও কার্যকর ও বিশেষ বরাদ্দের কথা বলা হয়নি। কেন্দ্রের জবাবে জানানো হয়েছে যে, অঙ্গনওয়াড়ি কর্মীদের স্মার্টফোন প্রদান, ইন্টারনেট খরচ এবং প্রতিটি অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রে শিশু ও মায়েদের উচ্চতা ও ওজন মাপার জন্য চার ধরনের গ্রোথ মনিটরিং ডিভাইস দেওয়া হচ্ছে, যার মধ্যে নষ্ট হওয়া যন্ত্র বদলাতে জেলায় ৫ শতাংশ বাফার রাখার নিয়ম রয়েছে। এছাড়া ২ লাখ অঙ্গনওয়াড়িকে সক্ষম অঙ্গনওয়াড়িতে রূপান্তর, পোশন ট্র্যাকার অ্যাপে ডেটা এন্ট্রি এবং আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকায় পিএম-জনমন ও ধর্তি আবা প্রকল্পের অধীনে নতুন অঙ্গনওয়াড়ি তৈরির কথা বলা হলেও, পরিকাঠামো বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে গ্রাউন্ড রিয়ালিটি ও রাজ্যগুলির নিজস্ব অভিজ্ঞতার বিষয়টি আড়ালেই রয়ে গিয়েছে। সামগ্রিকভাবে, অপুষ্টি দূরীকরণে কেন্দ্রীয় সরকারের বিশাল অঙ্কের দাবির পেছনে প্রকৃত আর্থিক স্বচ্ছতা ও আঞ্চলিক বৈষম্যের মূল জায়গাগুলোকে এড়িয়ে যাওয়ার এক কৌশল ফুটে উঠেছে এই জবাবে।
















