বিজেপি শাসিত উত্তরপ্রদেশের প্রয়াগরাজে এলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি ফি বৃদ্ধি এবং বিভিন্ন কোর্সে আসন সংখ্যা ব্যাপকভাবে কমিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে একদল ছাত্রের আন্দোলন এক মাসেরও বেশি সময় ধরে চলছে। গত ১০ জুলাই থেকে শুরু হওয়া এই আন্দোলনকে কেন্দ্র করে বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরের প্রধান প্রবেশদ্বার, ‘সেনেট গেট’, কার্যত প্রতিবাদের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে। গত ৪ অগাস্ট সেখানে দিশা এবং বিজেপির ছাত্র সংগঠন অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদ-এর সঙ্গে যুক্ত দুই ছাত্রগোষ্ঠীর মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে। অভিযোগ, সেই সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তাকর্মীরা কার্যত নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করেন।
ফি বৃদ্ধি, আসন কমানোর অভিযোগে উত্তপ্ত এলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়
Sponsored

অচলাবস্থা কাটাতে গত ৬ অগাস্ট বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এবং আন্দোলনকারী ছাত্রদের মধ্যে কয়েক ঘণ্টা ধরে বৈঠক হয়। পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকারি ইনস্টাগ্রাম হ্যান্ডেল থেকে দাবি করা হয়, শান্তিপূর্ণ আলোচনার মাধ্যমে আন্দোলন প্রত্যাহার করা হয়েছে। কিন্তু আন্দোলনকারী ছাত্রনেতারা তা অস্বীকার করেছেন। তাঁদের বক্তব্য, বৈঠক কোনও সমাধান ছাড়াই শেষ হয়েছে এবং তাঁদের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দাবি নিয়ে প্রশাসনের সঙ্গে কোনও সমঝোতা হয়নি। ৭ অগাস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের ওই পোস্টটি মুছে ফেলা হয় এবং ছাত্ররা ফের আন্দোলনে বসেন। এলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী এবং অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন-এর সদস্য সোনালি যাদবের দাবি, ৬ অগাস্টের বৈঠকে তিনি উপস্থিত ছিলেন এবং আলোচনা তিন থেকে চার ঘণ্টা ধরে চলে। তাঁর বক্তব্য, আন্দোলনকারীদের মূল দাবিগুলির মধ্যে পাঁচ ছাত্রের সাসপেনশন প্রত্যাহার এবং তাঁদের বিরুদ্ধে দায়ের করা এফআইআর প্রত্যাহারের বিষয়টি আলোচনায় নিষ্পত্তি হয়নি। প্রশাসন আন্দোলন শেষ হয়ে যাওয়ার যে দাবি করেছে, তা ‘উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভুল তথ্য’ বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
এই আন্দোলনকে ঘিরে ইতিমধ্যেই রাজনৈতিক বিতর্কও তীব্র হয়েছে। ৬ অগাস্ট প্রয়াগরাজে তাঁর ‘ছাত্রোঁ কি গুঞ্জ’ কর্মসূচির আগে বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী ছাত্রদের আন্দোলনের সমর্থনে সরব হন। সামাজিক মাধ্যম ‘এক্স’-এ তিনি অভিযোগ করেন, ফি বৃদ্ধি এবং আসন কমানোর বিরুদ্ধে এলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা তাঁদের ভবিষ্যতের জন্য লড়াই করছেন। তাঁর দাবি, ছাত্রদের কথা শোনার পরিবর্তে তাঁদের বিরুদ্ধে এফআইআর করা হচ্ছে এবং নরেন্দ্র মোদি সরকারের নীতি যুবসমাজের কণ্ঠস্বর দমন করা। প্রতিবাদ করলে লাঠিচার্জ, মামলা এবং আরও কঠোর দমনমূলক পদক্ষেপের মুখে পড়তে হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। রাহুলের ওই পোস্টটি ইতিমধ্যে ছয় হাজারেরও বেশিবার রিট্যুইট হয়েছে। রাহুল গান্ধীর বক্তব্যের জবাব দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষও। বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকারি এক্স হ্যান্ডেলে দাবি করা হয়েছে, ফি বৃদ্ধি চার বছর আগেই করা হয়েছিল এবং দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়, বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়, বাবাসাহেব ভীমরাও আম্বেদকর বিশ্ববিদ্যালয়সহ একাধিক প্রতিষ্ঠানের তুলনায় এলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের ফি এখনও কম। আসন কমানোর অভিযোগও অস্বীকার করেছে কর্তৃপক্ষ। তাদের বক্তব্য, বিশ্ববিদ্যালয়ে আসন কমানো হয়নি; বরং বহু নতুন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে ওঠায় পড়ুয়াদের একটি অংশ সেখানে চলে যাচ্ছে এবং ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের আসন পূর্ণ হচ্ছে না। অন্যদিকে আন্দোলনকারী ছাত্রনেতাদের দাবি, বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকস্তরে প্রতি বছর ১০ শতাংশ এবং স্নাতকোত্তর স্তরে ১৪ শতাংশ করে ফি বাড়ানোর সিদ্ধান্ত ছাত্রদের উপর আর্থিক চাপ তৈরি করছে। দিশার সঙ্গে যুক্ত ছাত্রনেতা চন্দ্রপ্রকাশের দাবি, বিশ্ববিদ্যালয়ে মোট আসন সংখ্যা প্রায় ৬,০০০ কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। এর প্রভাব বিভিন্ন বিভাগে স্পষ্ট। দর্শন বিভাগে আগে যেখানে ১৯২টি আসন ছিল, বর্তমানে তা কমিয়ে মাত্র ৫০টি করা হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।
ফি এবং আসন কমানোর পাশাপাশি ছাত্রদের আরও দুটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি রয়েছে। তা হল বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে বিশুদ্ধ পানীয় জলের ব্যবস্থা এবং শৌচাগারগুলির উন্নত পরিকাঠামো। চন্দ্রপ্রকাশের বক্তব্য, এসব সমস্যার সমাধানও দীর্ঘদিন ধরে হচ্ছে না। সেনেট গেটের সামনে হলুদ ত্রিপল পেতে বসে থাকা ছাত্রদের আন্দোলন এখন বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরের স্থায়ী দৃশ্যে পরিণত হয়েছে। আন্দোলনকারীদের পাশে দাঁড়িয়েছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারাও। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন সমাজবাদী পার্টির সাংসদ পুষ্পেন্দ্র সরোজ, আজাদ সমাজ পার্টির সভাপতি তথা ভীম আর্মির প্রধান চন্দ্রশেখর আজাদ এবং রাষ্ট্রীয় জনতা দলের সাংসদ সুধাকর সিং। এদিকে আন্দোলন নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সর্বশেষ সামাজিক মাধ্যম পোস্টে ছাত্রদের দাবি বা আলোচনার অগ্রগতির পরিবর্তে সেনেট গেট অবরোধের প্রসঙ্গই সামনে আনা হয়েছে। ৬ অগাস্টের ওই পোস্টে বলা হয়, ‘দুষ্কৃতীদের’ দ্বারা প্রধান প্রবেশদ্বার অবরুদ্ধ করার বিরুদ্ধে শিক্ষক ও কর্মীরা অবস্থান নিয়েছেন। এর সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন কর্মীর বৈঠকের একটি ভিডিও প্রকাশ করা হয়েছে। ফলে একদিকে ছাত্রদের ফি বৃদ্ধি, আসন কমানো, প্রশাসনিক পদক্ষেপ এবং পরিকাঠামোগত সমস্যার অভিযোগ, অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের দাবি—এই দুই বিপরীত অবস্থানের মধ্যে এলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের অচলাবস্থা এখনও কাটেনি। ৬ অগাস্টের আলোচনার পর আন্দোলন প্রত্যাহার হয়েছে বলে বিশ্ববিদ্যালয়ের দাবি প্রত্যাহার করে নেওয়া এবং পরদিন ছাত্রদের ফের প্রতিবাদে বসা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। এর সঙ্গে রাহুল গান্ধী-সহ বিরোধী রাজনৈতিক নেতাদের সমর্থন যুক্ত হওয়ায় এলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আন্দোলন এখন উত্তরপ্রদেশের বৃহত্তর রাজনৈতিক বিতর্কেরও অংশ হয়ে উঠেছে।
Sponsored

Sponsored

Sponsored

Sponsored













