দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) ও নির্বাচন কমিশনারদের (ইসি) বাছাই কমিটি থেকে দেশের প্রধান বিচারপতিকে বাদ দেওয়ার কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে দায়ের হওয়া মামলায় দ্বিধাবিভক্ত মত দিল সুপ্রিম কোর্ট। বিষয়টি পাঁচ বিচারপতির বৃহত্তর সাংবিধানিক বেঞ্চে পাঠানো উচিত কি না, তা নিয়েই মূলত একমত হতে পারেননি শীর্ষ আদালতের দুই বিচারপতি। ফলে পুরো প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের দায়িত্ব এখন বর্তাল দেশের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের উপরেই।

২০২৩ সালের ডিসেম্বরে পাশ হওয়া কেন্দ্রীয় আইনে নির্বাচন কমিশনারদের বাছাই কমিটি থেকে ভারতের প্রধান বিচারপতিকে সরিয়ে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার এক জন সদস্যকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। কেন্দ্রের সেই সিদ্ধান্তের সাংবিধানিক বৈধতাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে একাধিক মামলা দায়ের হয়েছিল। বিচারপতি দীপঙ্কর দত্ত ও বিচারপতি সতীশচন্দ্র শর্মাকে নিয়ে গঠিত অবকাশকালীন ডিভিশন বেঞ্চে টানা পাঁচ দিন শুনানির পর বুধবার দুই বিচারপতির বিপরীতমুখী অবস্থান সামনে আসে।

রায় দিতে গিয়ে বিচারপতি দত্ত বলেন, সর্বসম্মত রায় দিতে পারলে তা প্রাতিষ্ঠানিক সংহতির স্বার্থে ভালো হতো। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত মতপার্থক্য তৈরি হওয়ায় তাঁকে বিস্তারিত নির্দেশনামা লিখতে হয়েছে। কেন্দ্রের যুক্তি ছিল, বিষয়টি অত্যন্ত গভীর সাংবিধানিক তাৎপর্য বহন করে, তাই পাঁচ বিচারপতির বৃহত্তর বেঞ্চে এর শুনানি হওয়া প্রয়োজন। বিচারপতি দত্ত কেন্দ্রের সেই যুক্তি খারিজ করে দেন। অন্য দিকে, বিচারপতি শর্মা এই বিষয়ে তাঁর সঙ্গে সহমত হতে পারেননি। তবে এই সাংবিধানিক প্রশ্নের নিষ্পত্তিতে বৃহত্তর বেঞ্চ গঠন করা হবে কি না, সেই প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের ভার প্রধান বিচারপতির হাতেই ছেড়ে দেওয়ার বিষয়ে দুই বিচারপতিই একমত হয়েছেন। শুনানি চলাকালীন নির্বাচন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা বজায় রাখতে ক্রিকেটের রূপক টেনে কেন্দ্রকে তীব্র বার্তা দেন বিচারপতি দত্ত। তাঁর স্পষ্ট মন্তব্য, যে দল ব্যাট করছে তারাই যদি আম্পায়ার নির্বাচন করে, তবে সেই আম্পায়ারের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। এমনকি সেই আম্পায়ার যদি মাঠে সঠিক সিদ্ধান্তও নেন, তবুও তাঁর সততা সন্দেহের ঊর্ধ্বে থাকবে না। সাধারণ মানুষের চোখে তিনি সবসময় একটি নির্দিষ্ট দলের অনুগত হিসেবেই বিবেচিত হবেন। নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের প্রক্রিয়াকেও এমন পক্ষপাতদুষ্ট সন্দেহের ঊর্ধ্বে রাখা প্রয়োজন।

কমিশনের স্বাধীনতা প্রসঙ্গে বিচারপতি দত্ত আরও যোগ করেন, নির্বাচন কমিশনকে কেবল স্বাধীন হলেই চলবে না, সাধারণ মানুষের চোখে তাকে নিরপেক্ষ ও স্বাধীন হিসেবে প্রতীয়মানও হতে হবে। অবাধ ও সুষ্ঠু গণতন্ত্রের স্বার্থে নির্বাহী বিভাগের যাবতীয় প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণ থেকে কমিশনকে মুক্ত রাখা জরুরি। একই সঙ্গে বিচার বিভাগে নিয়োগ নিয়ে প্রচলিত ধারণা প্রসঙ্গেও কড়া পর্যবেক্ষণ উঠে আসে তাঁর পর্যবেক্ষণে। বিচারপতি দত্ত বলেন, বিচারকেরা নিজেরাই বিচারক নিয়োগ করেন— এটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন একটি অলীক ধারণা। স্বার্থান্বেষী মহলের উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারের ফলে তৈরি হওয়া এই দীর্ঘদিনের ভুল ধারণাটি অবিলম্বে দূর হওয়া প্রয়োজন।

উল্লেখ্য, ২০২৩ সালের ২ মার্চ শীর্ষ আদালতের পাঁচ বিচারপতির একটি সাংবিধানিক বেঞ্চ স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছিল, নির্বাচন কমিশনারদের নিয়োগ প্রক্রিয়ায় কার্যনির্বাহী বিভাগের প্রভাবমুক্ত রাখতে প্রধানমন্ত্রী, লোকসভার বিরোধী দলনেতা এবং দেশের প্রধান বিচারপতিকে নিয়ে গঠিত কমিটির সুপারিশেই রাষ্ট্রপতি তাঁদের নিয়োগ করবেন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে সংসদে নতুন আইন এনে প্রধান বিচারপতিকে বাদ দিয়ে একজন কেন্দ্রীয় মন্ত্রীকে সেই কমিটিতে স্থান দেয় সরকার, যা ঘিরেই বর্তমান আইনি সংঘাত। এবার প্রধান বিচারপতির কোর্টেই নির্ধারিত হবে এই মামলার পরবর্তী গতিপ্রকৃতি।