নির্বাচন কমিশনের চার দেওয়ালের অন্দরেই এ বার বিস্ফোরক সংঘাত। এতদিন বিরোধীরা যে অভিযোগ রাজপথে তুলে আসছিলেন, এ বার তা কার্যত স্বীকার করে নিলেন খোদ নির্বাচন সদনের শীর্ষ কর্তারা। ভোটার তালিকা তৈরির কাজ কি আর নিয়ম মেনে মাঠপর্যায়ের আধিকারিকদের হাতে রয়েছে, নাকি তথ্যপ্রযুক্তির অদৃশ্য ছাঁকনি দিয়ে দিল্লি থেকেই ঠিক হচ্ছে কার ভোটাধিকার থাকবে আর কার কাড়া হবে? দেশের দুই নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিংহ সঁধু ও বিবেক জোশীর অভ্যন্তরীণ ক্ষোভ প্রকাশ্যে আসতেই জাতীয় রাজনীতিতে নজিরবিহীন আলোড়ন শুরু হয়েছে। আর সেই বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছেন কমিশনের তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের ডিরেক্টর জেনারেল সীমা খন্না। 

মমতাপন্থী তৃণমূলের দাবি, এই সীমার বিরুদ্ধে প্রথম সরব হয়েছিলেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথায়, “সীমা খন্নার কথা প্রথম ফাঁস করেছিল অভিষেকই।” তৃণমূলের বক্তব্য, গত ডিসেম্বরে দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় যে অভিযোগ তুলেছিলেন, দুই কমিশনারের ক্ষোভ আসলে তারই প্রমাণপত্র। অভিষেক সে দিন প্রশ্ন তুলেছিলেন, বুথ স্তরের আধিকারিকদের দু’মাসের সরেজমিন যাচাইয়ের রিপোর্ট মাত্র এক ঘণ্টার মধ্যে কোন অ্যালগরিদমে বদলে দেওয়া হল? কার নির্দেশেই বা কাজ করছেন তথ্যপ্রযুক্তি শাখার প্রধান সীমা খন্না?

তৃণমূল সাংসদ মহুয়া মৈত্রের কথায়, সফ্‌টওয়্যারের পেছনের কারসাজি দিয়ে যে তালিকা বিকৃত করা হচ্ছিল, তা এখন দিনের আলোর মতো পরিষ্কার। বিষয়টিকে আরও এক ধাপ এগিয়ে সরাসরি রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তুলেছেন তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বুধবার তিনি দাবি করেন, কৃত্রিম মেধা এবং ডিজিটাল ছাঁকনি ব্যবহার করে বিরোধীদের লাখ লাখ ভোটারের নাম উধাও করে দেওয়া হয়েছে। গোটা প্রক্রিয়ায় যুক্ত আধিকারিকদের অবিলম্বে গ্রেফতারির দাবি তুলেছেন মমতা। নির্বাচন কমিশনের বিশ্বাসযোগ্যতা যেখানে দাঁড়িয়ে, সেখান থেকেই প্রযুক্তি ও আমলাতন্ত্রের এই আঁতাঁত এখন দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে এক তীব্র প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।

একটি জাতীয় সংবাদপত্রের চাঞ্চল্যকর তথ্য বলছে, বিধানসভা স্তরে ভোটার তালিকা সংযোজন ও সংশোধনের চূড়ান্ত আইনি কর্তৃত্ব থাকে নির্বাচনী নিবন্ধন আধিকারিক বা ইআরও-দের হাতে। কিন্তু ‘ইআরওনেট’ সরিয়ে ‘ইসিআইনেট’ আসতেই স্থানীয় আধিকারিকদের হাত-পা বেঁধে ফেলা হয়েছে বলে অভিযোগ তোলেন কমিশনার সঁধু। গত অগাস্টেই তিনি শীর্ষ মহলে স্পষ্ট বার্তা দেন, স্থানীয় আধিকারিকদের পোর্টালে ঢোকার ক্ষমতা ছাঁটাই করার আইনি এক্তিয়ার তথ্যপ্রযুক্তি প্রধান সীমা খন্নার নেই।

প্রযুক্তির এই কড়াকড়ির নির্মম ফল দেখা গিয়েছে গোয়ায়। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে তথ্যে অমিল থাকা আবেদনকারীদের শুনানির পর ৯৭ জনকে বৈধ নাগরিক বলে ছাড়পত্র দিয়েছিলেন গোয়ার ইআরও-রা। কিন্তু কমিশনের সফ্‌টওয়্যারে সেই রায় নথিবদ্ধ করে নাম ফিরিয়ে আনার (রোলব্যাক) কোনও বিকল্পই রাখা হয়নি। গোয়ার মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের দফতর দিল্লির কাছে চার-চারটি চিঠি পাঠিয়ে, সীমা খন্নাকে প্রতিলিপি দিয়েও কোনও সমাধান পায়নি। ফল যা হওয়ার তাই হয়েছে— আদালতের ছাড়পত্র পকেটে নিয়েও ভোটার তালিকা থেকে চিরতরে হারিয়ে গিয়েছেন ৯৭ জন নাগরিক।