লোকসভায় বিরোধী দলনেতা ও কংগ্রেস সাংসদ রাহুল গান্ধী এবং কেন্দ্রীয় সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী কিরেন রিজিজুর মধ্যে শনিবার মহিলা সংরক্ষণ বিলকে কেন্দ্র করে তীব্র বাকযুদ্ধ শুরু হয়। মহিলা সংরক্ষণ কার্যকর করার সঙ্গে প্রস্তাবিত লোকসভা আসন পুনর্বিন্যাস বা ডিলিমিটেশনকে যুক্ত করার কেন্দ্রীয় অভিসন্ধি নিয়ে লাগাতার সরব ইন্ডিয়া জোটভুক্ত দলগুলি। তৃণমূলের তরফে বিরোধিতা করেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। মোদি সরকারের এই উদ্যোগ নিয়ে এবার লোকসভার বিরোধী দলনেতার সঙ্গে সরকারের মতবিরোধ প্রকাশ্যে এল।
‘বিল তো ২০২৩-এই পাশ, ডিলিমিটেশনের সঙ্গে যোগ কেন?’ রিজিজুকে পাল্টা প্রশ্ন রাহুলের
Sponsored

গত ২০ জুলাই থেকে সংসদের বাদল অধিবেশন কার্যত অচল হয়ে থাকায় বিলটি নিয়ে বিরোধীদের সমর্থন আদায়ের জন্য গত কয়েকদিন ধরে রাহুল গান্ধীর সঙ্গে যোগাযোগ করছেন রিজিজু। শনিবার ফের রাহুল গান্ধীর উদ্দেশে আবেদন জানান রিজিজু। নারী স্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের অধিকার নিয়ে রাহুলের বক্তব্যের একটি ভিডিও নিজের সমাজমাধ্যমে পোস্ট করে সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী বলেন, কংগ্রেসের অবস্থানে নাকি ‘ইতিবাচক পরিবর্তন’ দেখা যাচ্ছে। তাঁর কথায়, মহিলাদের বিষয়ে রাহুল গান্ধীর মানসিকতায় দৃশ্যত পরিবর্তন এসেছে। একইসঙ্গে তিনি কংগ্রেসকে কোনও শর্ত ছাড়াই মহিলা সংরক্ষণ বিলকে সমর্থন করার আহ্বান জানান।
তবে রিজিজুর এই বক্তব্যের পাল্টা জবাব দিতে বেশি সময় নেননি রাহুল। প্রায় দু’ঘণ্টার মধ্যেই কংগ্রেস সাংসদ স্পষ্ট করে দেন, মহিলা সংরক্ষণ বিলকে সমর্থনের প্রশ্নে কংগ্রেসের অবস্থান নিয়ে নতুন করে কোনও সংশয় নেই। তাঁর বক্তব্য, ২০২৩ সালেই বিলটি কংগ্রেসের পূর্ণ সমর্থনে সংসদে সর্বসম্মতিক্রমে পাশ হয়েছে। রাহুল সাফ বলেন, বিলটি ইতিমধ্যেই কংগ্রেসের পূর্ণ সমর্থনে সর্বসম্মতিক্রমে পাশ হয়েছে। এরপরই তাঁর প্রশ্ন, তাহলে তিন বছর পরেও এটি কার্যকর করা হয়নি কেন? আর এখন কেন এটিকে অপ্রয়োজনীয়ভাবে ডিলিমিটেশনের সঙ্গে যুক্ত করা হচ্ছে? কোনও শর্ত ছাড়াই ২০২৩ সালের আইন কার্যকর করার দাবি জানান তিনি।
প্রসঙ্গত, ২০২৩ সালে সংসদের দুই কক্ষেই পাশ হয়েছিল মহিলা সংরক্ষণ আইন, যার সরকারি নাম ‘নারী শক্তি বন্দন অধিনিয়ম’। এই আইনে লোকসভা এবং রাজ্য বিধানসভাগুলিতে ৩৩ শতাংশ আসন মহিলাদের জন্য সংরক্ষণের বিধান রাখা হয়েছে। তবে আইনটি কার্যকর করার সময়সীমাকে পরবর্তী জনগণনা এবং তার পরবর্তী ডিলিমিটেশন প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছিল। ফলে বর্তমান কাঠামোয় এর বাস্তবায়ন ২০২৯-এর লোকসভা নির্বাচনের আগেই হবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
কেন্দ্রের বর্তমান প্রস্তাবের লক্ষ্য হল ২০১১ সালের জনগণনার তথ্য ব্যবহার করে মহিলা সংরক্ষণ দ্রুত কার্যকর করা এবং ২০২৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের আগেই তা বাস্তবায়নের পথ তৈরি করা। কিন্তু একইসঙ্গে লোকসভা কেন্দ্রগুলির সীমানা পুনর্নির্ধারণের সঙ্গে বিষয়টি যুক্ত করায় বিরোধীদের আপত্তি তৈরি হয়েছে। প্রস্তাবিত ডিলিমিটেশন কার্যকর হলে লোকসভার মোট আসন ৫৪৩ থেকে বেড়ে প্রায় ৮৫০ হতে পারে। এর মধ্যে প্রায় ৩৩ শতাংশ অর্থাৎ ২৭৩টি আসন মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত করার প্রস্তাব রয়েছে। কিন্তু জনসংখ্যার ভিত্তিতে আসন পুনর্বিন্যাসের বিরোধিতা করে আসছে দক্ষিণ ভারতের একাধিক রাজ্য ও বিরোধী দলগুলি। তাদের যুক্তি, ২০১১ সালের জনগণনার ভিত্তিতে জনসংখ্যা অনুসারে আসন বাড়ানো হলে তুলনামূলক বেশি জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়া উত্তর ভারতের রাজ্যগুলির রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে এবং দক্ষিণের রাজ্যগুলি তুলনায় ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ডিলিমিটেশন ও মহিলা সংরক্ষণকে একসঙ্গে কার্যকর করার লক্ষ্যে সংবিধান সংশোধনী বিল পাশ করানোর জন্য এর আগে এপ্রিল মাসে বিশেষ অধিবেশনেও উদ্যোগ নিয়েছিল সরকার। কিন্তু সেই চেষ্টা সফল হয়নি। এবার বাদল অধিবেশনে ফের বিলটি পাস করানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সংবিধান সংশোধনী বিল পাশ করাতে সংসদের দুই কক্ষেই দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রয়োজন। লোকসভায় বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ-র একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলেও এই ধরনের সংশোধনী পাশ করানোর মতো প্রয়োজনীয় দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যা তাদের হাতে নেই। ফলে কংগ্রেস এবং অন্যান্য বিরোধী দলের সমর্থন সরকারের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এই পরিস্থিতিতেই গত কয়েকদিনে রাহুল গান্ধীর সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করেছেন রিজিজু। গত ৫ অগাস্ট প্রায় ৫০ মিনিট রাহুলের সঙ্গে বৈঠক করেন তিনি। বৈঠকে ডিলিমিটেশনের সঙ্গে যুক্ত সংবিধান সংশোধনী বিলের পাশাপাশি সংশোধিত বিদেশি অনুদান নিয়ন্ত্রণ আইন বা এফসিআরএ বিল নিয়েও আলোচনা হয়। রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতির পর সরকার বিরোধীদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সংসদ সচল রাখার চেষ্টা করছে। তবে সূত্রের খবর, ৫ অগাস্টের বৈঠকে রাহুল স্পষ্ট করে দেন, মহিলা সংরক্ষণকে ডিলিমিটেশনের সঙ্গে যুক্ত করার প্রস্তাব বিরোধীদের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। পরদিন, ৬ অগাস্টও রিজিজু ফোনে রাহুলের সঙ্গে যোগাযোগ করেন বলে সূত্রের দাবি। তখন রাহুল জানান, কংগ্রেস বিষয়টি দলের অভ্যন্তরে এবং ইন্ডিয়া জোটের শরিকদের সঙ্গে আলোচনা করে নিজেদের অবস্থান জানাবে। এর পাশাপাশি, গত ২০ জুলাই ছাত্র আন্দোলনের বিরুদ্ধে পুলিশের দমন-পীড়ন নিয়ে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের বিবৃতি এবং সংসদে আলোচনার দাবিও জানিয়েছেন রাহুল। অযোধ্যার রামমন্দিরের অনুদান তছরুপের অভিযোগ নিয়েও সংসদে আলোচনা চেয়েছে বিরোধীরা। বাদল অধিবেশন শেষ হতে এখন মাত্র এক সপ্তাহের মতো সময় বাকি। ফলে মহিলা সংরক্ষণ ও ডিলিমিটেশন নিয়ে সরকারের সঙ্গে কংগ্রেসের বিরোধ কতটা মেটানো সম্ভব হবে, নাকি এই ইস্যুতেও সংসদ অচলাবস্থা অব্যাহত থাকবে—সেদিকেই এখন নজর রাজনৈতিক মহলের।
Sponsored

Sponsored

Sponsored

Sponsored













