বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের (Rabindranath Tagore) অনুরোধেই লিখতে শুরু করেছিলেন শিল্পগুরু অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তাঁর যে-কোনও কাজেই দারুণ ভরসা ছিল কবিগুরুর। ১৯৪১-এর ৭ অগাস্ট ছিল অবনীন্দ্রনাথের ৭০তম জন্মদিন। বাংলা তারিখ অনুযায়ী বাইশে শ্রাবণ। ওই দিনই চিরঘুমের দেশে পাড়ি দিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। আজ দুজনের সম্পর্কের সমীকরণ আলোকপাত করলেন অংশুমান চক্রবর্তী।
অবনীন্দ্রনাথের রবীন্দ্রনাথ
Sponsored

শিল্পগুরু অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর। মূলত রেখার জগতের মানুষ। অনেক পরে প্রবেশ করেছিলেন লেখার জগতে। বলা হয়— তিনি ছবি লিখতেন আর কথা আঁকতেন। তাঁর অসাধারণ গদ্যের শুরুর দিনগুলোর সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে ছিলেন পিতৃব্য রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। ছোটদের উপযোগী বিশুদ্ধ বাংলা বইয়ের অভাব দূর করতে রবীন্দ্রনাথই অবনীন্দ্রনাথকে লেখার অনুরোধ করেন। বলেন, ‘‘অবন, তুমি লেখো-না,— যেমন ক’রে মুখে মুখে গল্প ক’রে শোনাও, তেমনি ক’রেই লেখো।’’ প্রথমদিকে একেবারেই সাহস পাননি অবনীন্দ্রনাথ। ভরসা দিয়ে রবীন্দ্রনাথ বলেন, ‘‘তুমি লিখে যাও, আমি তো আছিই। ভাষার কোনও দোষ হ’লে তার ভার আমার ওপরেই না-হয় ছেড়ে দিয়ো, শুধ্রে দেবো।’’ উৎসাহ পেয়ে অবনীন্দ্রনাথ লিখলেন ‘শকুন্তলা’। রবীন্দ্রনাথ মন দিয়ে আগাগোড়া পড়লেন। কিছুই কাটলেন না। অবনীন্দ্রনাথ বল পেলেন। তারপর একে একে লিখলেন ‘ক্ষীরের পুতুল’, ‘রাজকাহিনী’, ‘বুড়ো আংলা’, ‘ভূতপত্রীর দেশে’।

অবনীন্দ্রনাথ বারবার জানিয়েছেন, ‘‘গল্প লেখা আমার আসতো না। রবিকা-ই আমার গল্প-লেখার বাতিকটা ধরিয়েছিলেন।’’ তিনি ছিলেন রবীন্দ্র-প্রভাব থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত। সৃষ্টি করেছিলেন নিজস্ব ভাষা। অবনীন্দ্রনাথ ছোটদের জন্য লিখতেন সহজ-সরল ভাবে। বড়দের জন্য লিখেছিলেন ‘বাংলার ব্রত’, ‘কথিকা’, ‘আপন কথা’র মতো প্রবন্ধ। সেই লেখা সম্পর্কে মন্তব্য করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। পাণ্ডুলিপি পড়ে চিঠি দিয়েছিলেন স্নেহের ভাইপোকে, ‘‘অবন, কী চমৎকার— তোমার বিবরণ শুনতে শুনতে আমার মনের মধ্যে মরা গাঙে বান ডেকে উঠল। বোধ হয় আজকের দিনে আর দ্বিতীয় কোনও লোক নেই যার স্মৃতি-চিত্রশালায় সেদিনকার যুগ এমন প্রতিভার আলোকে প্রাণে প্রদীপ্ত হয়ে দেখা দিতে পারে— এ তো ঐতিহাসিক পাণ্ডিত্য নয়, এ যে সৃষ্টি— সাহিত্যে এ পরম দুর্লভ।’’ পরে ‘ঘরোয়া’র ভূমিকায় রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, ‘‘আমার জীবনের প্রান্তভাগে যখন মনে করি সমস্ত দেশের হয়ে কাকে বিশেষ সম্মান দেওয়া যেতে পারে তখন সর্বাগ্রে মনে পড়ে অবনীন্দ্রনাথের নাম। তিনি দেশকে উদ্ধার করেছেন আত্মনিন্দা থেকে, আত্মগ্লানি থেকে তাকে নিষ্কৃতি দান করে তাঁর সম্মানের পদবী উদ্ধার করেছেন। তাঁকে বিশ্বজনের আত্ম-উপলব্ধিতে সমান অধিকার দিয়েছেন।’’
ছবি নিয়ে অবনীন্দ্রনাথের ছিল প্রগাঢ় পাণ্ডিত্য, গভীর ভালবাসা। তাঁর যে কোনও কাজেই দারুণ ভরসা ছিল রবীন্দ্রনাথের। ‘চিত্রাঙ্গদা’ শেষ করে তিনি অবনীন্দ্রনাথকে বলেছিলেন, ‘‘অবন, তোমায় ছবি দিতে হবে চিত্রাঙ্গদার জন্যে।’’ অবনীন্দ্রনাথের বাড়িতেই ছিল স্টুডিয়ো। রবীন্দ্রনাথ দেখিয়ে দিয়েছিলেন চিত্রাঙ্গদার ছবি ঠিক কেমন হবে। সেই প্রসঙ্গে অবনীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, “এই হল রবিকাকার সঙ্গে আমার প্রথম আর্ট নিয়ে যোগ। তার পর থেকে এত কাল রবিকার সঙ্গে বহু বার আর্টের ক্ষেত্রে যোগাযোগ হয়েছে, প্রেরণা পেয়েছি তাঁর কাছ থেকে। আজ মনে হচ্ছে আমি যা কিছু করতে পেরেছি তার মূলে ছিল তাঁর প্রেরণা।” কাকা-ভাইপো। রবীন্দ্রনাথ ও অবনীন্দ্রনাথ। দুজনের বয়সের ব্যবধান ছিল ১০ বছর। রবীন্দ্রনাথের রাখিবন্ধন ও স্বদেশি অন্দোলনের প্রিয় ভাইপো ছিলেন অন্যতম সঙ্গী এবং উদ্যোক্তা। ‘জোড়াসাঁকোর ধারে’ গ্রন্থে অবনীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, “রবিকা বলতেন ‘অবন একটা পাগলা’ সে কথা সত্যি। আমিও এক এক সময় ভাবি, কী জানি কোন্ দিন হয়তো সত্যি খেপে যাব।”
রবীন্দ্রনাথের নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তির পিছনে পরোক্ষভাবে ভূমিকা ছিল অবনীন্দ্রনাথের। তখন চিত্রশিল্পী হিসেবে বিশ্বজোড়া খ্যাতি উইলিয়ম রোটেনস্টাইনের। তিনি ভারতীয় শিল্পকলার প্রতি আশ্চর্য টান অনুভব করতেন। ১৯১০ সালে ভারতবর্ষে আসেন। পরিচিত হন অবনীন্দ্রনাথের সঙ্গে। কলকাতায় থাকার সময় রোটেনস্টাইন জোড়াসাঁকোতে যেতেন অবনীন্দ্রনাথের সঙ্গে বাংলার নব্য শিল্পচর্চা নিয়ে আলোচনা করতে। আলোচনা সভায় রবীন্দ্রনাথ থাকতেন শ্রোতা হিসেবে। রোটেনস্টাইন তখনও জানতেন না রবীন্দ্রনাথের প্রতিভার কথা। একজন চিত্রকর হিসেবে তাঁর রবীন্দ্রনাথের ওই শান্ত, শোভন মূর্তি ভালো লাগত। রোটেনস্টাইন সেই সময় রবীন্দ্রনাথের একটি প্রতিকৃতি আঁকেন। সেই প্রতিকৃতি ‘গীতাঞ্জলি’ বইয়ে রয়েছে। ‘গীতাঞ্জলি’-র ইংরেজি অনুবাদ ‘Song Offerings’-এর জন্য রবীন্দ্রনাথ নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন। তার অন্তরালে রোটেনস্টাইনের অবদান কিছু কম ছিল না। এই দুজনের মধ্যে সেতু রচনা করেছিলেন অবনীন্দ্রনাথই।তাঁর ইংরেজি জন্ম তারিখ ৭ অগাস্ট। সেই উপলক্ষে একবার রবীন্দ্রনাথের ইচ্ছেতেই জোড়াসাঁকোর পাঁচ নম্বর বাড়ির দক্ষিণের বারান্দায় শান্তিনিকেতনের কলাভবনের শিক্ষক এবং ছাত্র-ছাত্রীরা মিলে অবনীন্দ্র-জয়ন্তী পালন করেছিলেন। উপস্থিত ছিলেন নন্দলাল বসু, গৌরী ভঞ্জ, রানি চন্দ, বিনায়ক মাসোজি প্রমুখ। ঠাকুরবাড়িতে বরাবরই জন্মাষ্টমীর দিনে অবনীন্দ্রনাথের জন্মদিন পালন করা হত। তবে তাঁর অন্যতম কৃতী ছাত্র মুকুলচন্দ্র দে প্রতি বছর ৭ অগাস্ট জোড়াসাঁকোর বাড়িতে এসে জন্মদিন পালন করতেন। ১৯৪১-এর ৭ অগাস্ট ছিল অবনীন্দ্রনাথের ৭০তম জন্মদিন। রবীন্দ্রনাথ চেয়েছিলেন দিনটা যথাযথভাবে পালিত হোক। কিন্তু সেটা হয়নি। সেই দিন রচিত হয়েছিল শোকের আবহ। কারণ, ওই দিনই চিরঘুমের দেশে পাড়ি দিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। ভগ্ন হৃদয়ে অবনীন্দ্রনাথ পাঁচ নম্বর বাড়ির দক্ষিণের বারান্দায় বসে এঁকেছিলেন একটি ছবি— সেই ছবি রবীন্দ্রনাথের অন্তিমযাত্রার। বাংলা তারিখ অনুযায়ী দিনটা ছিল বাইশে শ্রাবণ।
Sponsored

Sponsored

Sponsored

Sponsored













