রাগ সঙ্গীতের পাশাপাশি আধুনিক বাংলা গানেও বৈচিত্র্য দেখিয়েছিলেন কৃষ্ণচন্দ্র দে। জয় করেছিলেন তামাম সঙ্গীতপ্রেমীর হৃদয়। অভিনয়ও করেছেন। মঞ্চে, চলচ্চিত্রে। আগামীকাল জন্মদিন। স্মরণ করলেন অংশুমান চক্রবর্তী।
জন্মান্ধ ছিলেন না। দু’চোখে আলো নিয়েই পৃথিবীতে এসেছিলেন। উপভোগ করেছেন প্রকৃতির অপরূপ রূপ। আকাশ থেকে শুষে নিয়েছেন নীল। গাছ থেকে সবুজ। নানা রঙের ফুলের সৌন্দর্য দেখে ঢেউ উঠত মনে। জন্ম নিত সুর। গুনগুন করতেন। যা শুনতেন, হুবহু মুখস্থ হয়ে যেত। এইভাবেই কাটছিল ঝলমলে দিনগুলো। বারো বছর পর্যন্ত পড়তে হয়নি কোনও সমস্যায়। কিন্তু তেরোয় পা রাখতেই জীবনটা ওলটপালট হয়ে গেল। ধীরে ধীরে আঁধার নেমে এল দুটি চোখে। কালোর চাদরে ঢাকা পড়ল সমস্ত আলো। দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে গেল চিরকালের জন্য। তবে তাঁর কণ্ঠ পেল প্রাণ। সমস্ত প্রতিবন্ধকতা দূরে সরিয়ে গান দিয়েই জয় করেছিলেন তামাম সঙ্গীতপ্রেমীর হৃদয়। তিনি কৃষ্ণচন্দ্র দে (Krishna Chandra Dey)।
কলকাতার সিমলে পাড়ার মদন ঘোষ লেনে এক মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম। ১৮৯৪ সালের ২৪ অগাস্ট। মতান্তরে ১৮৯৩ সালে। জন্মাষ্টমীতে জন্ম। তাই নামকরণ হয়েছিল কৃষ্ণচন্দ্র। ডাকনাম ছিল বাবু। পিতা শিবচন্দ্র দে এবং মাতা রত্নমালা দেবী। কম বয়সে দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে কৃষ্ণচন্দ্র আঁকড়ে ধরেছিলেন গানকে। তালিম নিয়েছেন বিখ্যাত খেয়ালি শশীভূষণ দে-র কাছে। টপ্পার শিক্ষা নেন সতীশচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কাছে। পরবর্তী সময়ে তালিম নিয়েছেন কেরামতুল্লা খাঁ, বদল খাঁ, দবির খাঁ, জমিরউদ্দিন, মহেশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের কাছে। রাধারমণ দাসের কাছে শিখেছেন কীর্তন। হিন্দি ও উর্দু উচ্চারণ সঠিক করার জন্য মৌলবির কাছেও শিক্ষা নেন।সেই সময় নির্মলচন্দ্র স্ট্রিটের বেচারাম চন্দ্রের বাড়িতে বসত ধ্রুপদী সঙ্গীতের আসর। ১৯১৬ নাগাদ সেই বাড়িতেই আয়োজিত এক আসরে উপস্থিত ছিলেন নামকরা শিল্পীরা। কেরামতুল্লা খাঁর অনুরোধে খেয়াল গেয়ে আসর মাত করেছিলেন কৃষ্ণচন্দ্র। সেই থেকেই কলকাতা এবং মফস্সলের বিভিন্ন আসরে তাঁর ডাক আসতে থাকে।
কৃষ্ণচন্দ্রের প্রথম গানের রেকর্ড প্রকাশিত হয় মাত্র ১৮ বছর বয়সে। এইচএমভি থেকে। গান দু’টি ছিল ‘আর চলে না চলে না মোগো’ এবং ‘মা তোর মুখ দেখে কি’।শুধু রাগসঙ্গীত নয়, আধুনিক বাংলা গানেও কৃষ্ণচন্দ্র বৈচিত্র্য দেখিয়েছিলেন।দরদি মনের মানুষ ছিলেন কৃষ্ণচন্দ্র। সৌম্যকান্তি। সদাহাস্য। মিষ্টভাষী। সব সময়ে পরিপাটি বেশভূষায় থাকতেন। ব্যাক ব্রাশ চুল। গায়ে সিল্কের পাঞ্জাবি। কোঁচানো ধুতি। একটা সময় অভিনয়ও করেছেন। প্রথম মঞ্চে অভিনয় ১৯২৪ সালে। নাট্যাচার্য শিশিরকুমার ভাদুড়ীর আমন্ত্রণে।অ্যালফ্রেড থিয়েটারে ‘বসন্তলীলা’ নাটকে। বসন্তদূতের ভূমিকায়। ‘সীতা’ নাটকে গেয়েছিলেন ‘অন্ধকারের অন্তরেতে অশ্রু বাদল ঝরে’ গানটি। ১৯৩৩ সালে এই গানটি ‘সীতা’ ছবিতে গেয়েছিলেন। অন্যান্য নাটকের মধ্যে ‘প্রফুল্ল’, ‘চন্দ্রগুপ্ত’, ‘বিসর্জন’, ‘জয়দেব’, ‘দেবদাসী’ উল্লেখযোগ্য। এক সময়ে শিশিরকুমার ভাদুড়ী রবীন্দ্রনাথের ‘বিসর্জন’ মঞ্চস্থ করেন। তাতে অন্ধ ভিখারির চরিত্রে অভিনয় করেন কৃষ্ণচন্দ্র। দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর সঙ্গীত পরিচালনার দায়িত্বে থাকলেও কৃষ্ণচন্দ্র গান শিখেছিলেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথের কাছেই।
থিয়েটারের পাশাপাশি তিরিশের দশক থেকেই চলচ্চিত্রে তাঁর গান গাওয়া শুরু। দেবকী বসুর পরিচালনায় ‘চণ্ডীদাস’ ছবিতে তাঁর কণ্ঠে ‘সেই যে বাঁশি বাজিয়েছিলে’, ‘ফিরে চল আপন ঘরে’, ‘শতেক বরষ পরে’, ‘ছুঁয়ো না ছুঁয়ো না বধূ’ মানুষের মুখে মুখে ফিরেছিল। অন্যান্য ছবির মধ্যে ‘ভাগ্যচক্র’, ‘দেবদাস’, ‘গৃহদাহ’, ‘বিদ্যাপতি’, ‘চাণক্য’, ‘আলোছায়া’, ‘পূরবী’, ‘বামুনের মেয়ে’, ‘মীনাক্ষী’ উল্লেখযোগ্য।কৃষ্ণচন্দ্রের গাওয়া গানগুলি জনপ্রিয় হওয়ার নেপথ্যে সুরকার ও গীতিকারদের ভূমিকাও ছিল গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, হেমেন্দ্রকুমার রায়, চণ্ডীদাস, বাণীকুমার, অজয় ভট্টাচার্য, শৈলেন রায়, প্রণব রায় প্রমুখ গীতিকারের লেখায় এবং রাইচাঁদ বড়াল, পঙ্কজকুমার মল্লিকের সুরে গানগুলি আজও অবিস্মরণীয়।বহু ছবিতে কৃষ্ণচন্দ্র নিজেও সুর করেছিলেন। তাঁর নিজের কে সি দে প্রোডাকশন্সের ‘পূরবী’ এক উজ্জ্বল নজির। এই ছবির সঙ্গীত পরিচালনা করেন কৃষ্ণচন্দ্র এবং তাঁর ভ্রাতুষ্পুত্র প্রণব দে। ছবিতে সঙ্গীতাচার্য চন্দ্রনাথের ভূমিকায় অভিনয় করেন কৃষ্ণচন্দ্র। তাঁর অগাধ সঙ্গীতের উত্তরাধিকার পেয়েছিলেন তিন ভ্রাতুষ্পুত্র প্রণব দে, প্রবোধ দে বা মান্না দে ও প্রভাস দে। শচীন দেব বর্মণের প্রথম সঙ্গীত শিক্ষক ছিলেন তিনি।একটা সময় হিন্দি ছবির গানের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলেন কৃষ্ণচন্দ্র। চারের দশকের গোড়ায় মুম্বই গিয়েছিলেন। হিন্দি ছবির অসংখ্য জনপ্রিয় গানের সুরারোপ ও সঙ্গীত পরিচালনা করেন। মহম্মদ রফি, মুকেশ, কিশোর কুমার-সহ অনেকেই গেয়েছেন তাঁর সুরে।রাগাশ্রয়ী গানের পাশাপাশি গাইতেন কীর্তন। তাঁর গাওয়া দেশাত্মবোধক ‘মুক্তির মন্দির সোপান তলে’ গানটি সেই সময়ে মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে গিয়েছিল। রাগাশ্রয়ী গানের মধ্যে রয়েছে ‘ওই মহাসিন্ধুর ওপার থেকে’, ‘ঘন তমসাবৃত ধরণী’, ‘মেঘ হেরি নীল গগনে’, ‘ঘন ডম্বরু বাজে’, ‘স্বপন যদি মধুর এমন' প্রভৃতি। গায়কিতে এবং সঙ্গীত সৃজনে নতুন এক ধারার প্রবর্তন করেন কৃষ্ণচন্দ্র। ধ্রুপদ, ধামার, খেয়াল, লোকগান কিংবা কীর্তনের সুর ভেঙে সৃষ্টি করেন নতুন এক সম্পদ।
কলকাতা বেতারকেন্দ্রের শুরু থেকে জড়িয়ে ছিলেন কৃষ্ণচন্দ্র। প্রথমদিন ছিলেন দ্বিতীয় শিল্পী। একটানা ধ্রুপদী সঙ্গীত গেয়েছিলেন। বেতারকেন্দ্রে কৃষ্ণচন্দ্রের সঙ্গে পরিচয় হয় চারুচন্দ্র বসুর কন্যা রমা ওরফে তারকবালার। তিনিই মিস লাইট নামে পরিচিত ছিলেন। কৃষ্ণচন্দ্র মিস লাইটকে জীবনসঙ্গিনী রূপে গ্রহণ করেন। পরে তাঁদের একটি পুত্রসন্তান হয়েছিল। তবে মাত্র ১৪ বছর বয়সে সেই পুত্রের মৃত্যু হয়।কৃষ্ণচন্দ্র জীবনে বহু আঘাত পেয়েছেন। দৃষ্টিহীনতার কারণে সহ্য করেছেন অপমান। তবু অন্তরের মহত্ত্ব দিয়ে রাগ, অভিমান, ঘৃণা ইত্যাদি ত্যাগ করতে পেরেছিলেন। ১৯৬২ সালের ২৮ নভেম্বর ৬৯ বছর বয়সে তিনি পাড়ি দেন না-ফেরার দেশে। রসিক শ্রোতাদের অনেকেই আজও তাঁর গান শোনেন, তাঁকে নিয়ে চর্চা করেন।
















