পুজো আসলেই বারবার ফিরে ফিরে আসে ৫৭২ বছরের পুরোনো ইতিহাস। সময়ের নিয়মে আয়োজনের রীতিনীতি বদলালেও কোন্নগরের (Konnagar) ঘোষাল বাড়ির দুর্গাপুজোয় এখনও অমলিন বহু প্রাচীন প্রথা। সপ্তমী ও নবমীতে দেবীর ভোগে মাছ থেকে শুরু করে দশমীতে পরিবারের সকলে একসঙ্গে পাত পেড়ে  খাওয়া আবার বিসর্জনের আগে পান্তা ভাত ও ইলিশ দিয়ে দেবীকে বরণ সবই চলছে সেই ৫৭২ বছর আগের মতোই। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসছে এই রীতি। পরিবারের দাবি, এত দীর্ঘ ইতিহাসে কখনও বন্ধ হয়নি এই পুজো। 

ঘোষাল বাড়ির প্রবীণ সদস্য তথা প্রাক্তন বিধায়ক প্রবীর ঘোষাল জানান, তাঁদের পুজো শুধু পরিবারের ঐতিহ্য নয়, বাংলার অন্যতম প্রাচীন দুর্গোৎসবও। সময়ের সঙ্গে আয়োজনের কিছু পরিবর্তন হলেও পুজোর মূল রীতি-নীতি একই রয়েছে। সপ্তমী ও নবমীর ভোগে দেবীকে দেওয়া হয় পরিবারের দেবোত্তর সম্পত্তির পুকুরের মাছ। দশমীতে পরিবারের সদস্যরা একসঙ্গে বসে মাছ-ভাত খান। আর বিসর্জনের আগে বাড়ির মহিলারা পান্তা ভাত ও ইলিশ মাছ মুখে দিয়ে দেবীকে বরণ করেন। এরপর হয় সিঁদুর খেলা।

এই বাড়ির দুর্গাপুজোর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে নানা কাহিনিও। প্রবীরের কথায়, বাড়ির লাগোয়া নিমগাছের কোটর থেকে স্বপ্নাদেশের মাধ্যমে নারায়ণ শিলার সন্ধান মেলে। সেই শিলা আজও নাটমন্দিরে সারা বছর পূজিত হয়। তাঁর দাবি, জমিদারির সময় মোগল আমলে পুজোর জন্য সাড়ে ৭০০ টাকা অনুদানও মিলত। পরবর্তীতে ইংরেজ আমলেও সেই অনুদান চালু ছিল এবং স্বাধীনতার পরও তা বন্ধ হয়নি। যদিও সময়ের সঙ্গে সেই অর্থের মূল্য কার্যত নগণ্য হয়ে গিয়েছে।
শুধু পুজো নয়, ঘোষাল বাড়ির নাটমন্দিরও এই পরিবারের সাংস্কৃতিক ইতিহাসের সাক্ষী। 

জানা যায়, একসময় এই বাড়িতে পুজোর সময় ওস্তাদ বড়ে গুলাম আলি খাঁ থেকে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের মত বহু বিশিষ্ট শিল্পী আলোকিত করেছেন। পরিবারের সদস্য সত্যেন ঘোষালের উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতচর্চার সূত্রেও এই বাড়ির সঙ্গে বহু শিল্পীর যোগাযোগ ছিল। বর্তমানে সেই ধারার বদলে পরিবারের সদস্যদের নিয়েই সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়। এ বার তার মূল বিষয় ‘শতবর্ষে উত্তম কুমার’। বাংলা সিনেমার কিংবদন্তি অভিনেতার জন্মশতবর্ষকে সামনে রেখে নাটক ও অন্যান্য সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হবে।

আরও পড়ুন: ‘জয় বাংলা’স্লোগানে বিপত্তি! জাসদ দফতরে বিএনপির হামলা

এই পুজোর বিসর্জনেও থাকে বিশেষ চমক।  দিনের আলোতেই প্রতিমা নিরঞ্জন করা হয়। কয়েকশো বছর আগে সন্ধেবেলায় নৌকায় করে বিসর্জন দেওয়ার সময় বাঘের হামলায় এক ব্যক্তির মৃত্যু হয়। তার পর থেকেই দিনের বেলায় বিসর্জনের রীতি চালু হয়। আজও সেই প্রথা বজায় রয়েছে।

পরিবারের নবীন সদস্যা সায়ন্তী ঘোষালের কথায়, কর্মসূত্রে পরিবারের অনেকেই বাইরে থাকেন। ফলে পুজোর সময় সরাসরি উপস্থিত থাকতে না পারলেও ভিডিও কলের মাধ্যমে কে কী দায়িত্ব নেবেন, তা ঠিক হয়। ভোগ বিতরণ থেকে প্রসাদ তৈরি ছোটরাও নানা কাজে অংশ নেন। তাঁর কথায়, পুজোর আসল উদ্দেশ্যই হল পরিবারের সবাইকে একসঙ্গে করা।