গণতান্ত্রিক পরিকাঠামোয় নাগরিক অধিকার রক্ষা এবং আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগের দাবিতে কলকাতায় এক মঞ্চে একত্রিত হলেন প্রাক্তন বিচারপতি, শীর্ষ আদালতের আইনজীবী, মানবাধিকার কর্মী ও শিক্ষাবিদেরা। রবিবার সায়েন্স সিটি কনভেনশন সেন্টারে অ্যাসোসিয়েশন ফর প্রোটেকশন অব সিভিল রাইটস (এপিসিআর)-এর পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। ‘ন্যায়বিচারের জন্য আইনজীবী ও অধিকারকর্মী’ শীর্ষক এই সম্মেলনে দেশের বর্তমান মানবাধিকার পরিস্থিতি ও বিচারব্যবস্থার ভূমিকা নিয়ে বিশদ আলোচনা হয়।

সম্মেলনের সমাপ্তি অধিবেশনে বম্বে হাই কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি অভয় মহাদেব থিপসে বলেন, নাগরিকদের অধিকার সুনিশ্চিত করতে হলে স্বাধীন বিচারব্যবস্থা ও আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ একান্ত প্রয়োজন। কোনো রকম ভয়, চাপ কিংবা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সামাজিক অবস্থানের তোয়াক্কা না করে আইনের শাসন সমুন্নত রাখাই আইনজীবীদের প্রাথমিক দায়িত্ব হওয়া উচিত।

দিল্লিতে সাম্প্রতিক একটি বিক্ষোভ থেকে আইনজীবী ও সমাজকর্মীদের আটক করার প্রসঙ্গ তুলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন সুপ্রিম কোর্টের প্রবীণ আইনজীবী প্রশান্ত ভূষণ। তাঁর বক্তব্য, শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার ও ভিন্নমত প্রকাশের স্বাধীনতা গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি। বিক্ষোভস্থলে যাওয়ার পথে আইনজীবীদের আটক করা অত্যন্ত উদ্বেগজনক এবং তা সরাসরি আইনের শাসনকে দুর্বল করে তোলে। পুলিশের যেকোনো পদক্ষেপ আইনের সীমার মধ্যে এবং সুনির্দিষ্ট নিয়মে হওয়া আবশ্যক বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

অধিকার রক্ষার লড়াইয়ে হতাশ না হয়ে সম্মিলিত প্রচেষ্টায় অবিচল থাকার বার্তা দেন মানবাধিকার কর্মী নাদিম খান। প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও মানুষের পাশে দাঁড়ানোর তাগিদ দেন তিনি। অন্য দিকে দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক অপূর্বানন্দ বলেন, গণতান্ত্রিক সমাজে নাগরিকদের মতামত প্রকাশের পরিসর বজায় রাখা কেবল আইনজীবী বা কর্মীদের কাজ নয়; সাংবিধানিক মূল্যবোধ ও সাম্য রক্ষায় বৃহত্তর নাগরিক সমাজকেও এগিয়ে আসতে হবে।

সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন সমাজকর্মী যোগেন্দ্র যাদব, সমাজনেতা মালিক মোহতাসিম খান, মানবাধিকার কর্মী সুজাত ভদ্র, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য ভাস্কর গুপ্ত, প্রাক্তন সহকারী সলিসিটর জেনারেল মুখতার খান, কলামলেখক বর্ণালী বন্দ্যোপাধ্যায় এবং আইনজীবী সৈয়দ শহিদ ইমাম প্রমুখ। অনুষ্ঠানটির সঞ্চালনা করেন গবেষক ফাওয়াজ শাহিন ও উমর আওয়াইস।

এই সম্মেলনের মধ্য দিয়েই রাজ্যে এপিসিআর-এর আনুষ্ঠানিক কার্যক্রমের সূচনা ঘটে। আইনি সহায়তা, মানবাধিকার লঙ্ঘন সংক্রান্ত অভিযোগ ও তথ্যানুসন্ধানের কাজে সাধারণ মানুষের সুবিধার জন্য একটি হেল্পলাইন নম্বর প্রকাশ করা হয়। পাশাপাশি ভোটার তালিকায় নাম পুনর্বহালের আবেদন জানানোর লক্ষ্যে একটি বিশেষ পোর্টাল চালুর কথাও উদ্যোক্তারা জানান। সব মিলিয়ে রাজ্য জুড়ে নাগরিক ও সাংবিধানিক অধিকার সুরক্ষায় সম্মিলিত লড়াইয়ের ডাক দেওয়া হয় এই সম্মেলন থেকে।