মেয়ের ছবি বুকে নিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর জনতার দরবারে (Janatar Darbar) হাজির সিউড়ির এক দম্পতি। গত ছ’মাস ধরে নিখোঁজ ২৪ বছরের অমৃতা সিনহা (Amrita Singha)। মেয়ের সন্ধান পেতে এবার মুখ্যমন্ত্রীর কাছে সাহায্যের আবেদন জানালেন তাঁর মা-বাবা। জনতার দরবার থেকেই হয়তো মিলবে মেয়ের খোঁজ- সেই আশাতে বুকে বেঁধে বুধবার মুখ্যমন্ত্রীর কাছে পৌঁছন দম্পতি। 

জনতার দরবারে এদিন অর্ধেন্দুর সঙ্গে কথা বলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari)। মুখ্যমন্ত্রী তাঁকে আশ্বস্ত করেছেন যে অমৃতাকে খুঁজে বার করার জন্য ব্যবস্থা করবেন তিনি। মুখ্যমন্ত্রীর কাছ থেকে এই আশ্বাস পেয়ে কিছুটা হলেও স্বস্তি ফিরেছে ছ’মাস ধরে মেয়ের অপেক্ষায় থাকা পরিবারে। অর্ধেন্দুর কথায়, মুখ্যমন্ত্রী তাঁদের চিন্তা না করে নিরাপদে বাড়ি ফিরে যেতে বলেছেন এবং মেয়েকে খুঁজে দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন। সেই ভরসাতেই এবার নতুন করে মেয়ের ফিরে আসার অপেক্ষা করছেন বাবা-মা।

তবে মুখ্যমন্ত্রীর কাছে পৌঁছনোর পথটাও সহজ ছিল না। কয়েক দিন আগে তারাপীঠে মুখ্যমন্ত্রীর কর্মসূচির কথা জানতে পেরে সেখানে ছুটে গিয়েছিলেন অর্ধেন্দু। গলায় মেয়ের ছবি ও আবেদন লেখা প্ল্যাকার্ড ঝুলিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর নজরে আসার চেষ্টা করেছিলেন তিনি। কিন্তু নিরাপত্তাজনিত কারণে সে বার দেখা করার অনুমতি মেলেনি। এরপর জনতার দরবারে দেখা করার জন্য কয়েক দিন আগেই আবেদন করেছিলেন অর্ধেন্দু। মঙ্গলবার রাতে তাঁদের কাছে খবর আসে, বুধবার সকালে জনতার দরবারে যেতে হবে। সেই মতো ভোরেই স্ত্রীকে নিয়ে ট্রেনে সিউড়ি থেকে কলকাতার উদ্দেশে রওনা দেন তিনি।

অমৃতা বীরভূমের (Birbhum) সিউড়ির (Suri) ডাঙ্গালপাড়ার বাসিন্দা। গত ১৩ মার্চ দুপুরে বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলেন তিনি। সিউড়ি থেকে রাজগ্রামের (Rajgram) একটি বাসে উঠেছিলেন তরুণী। তারপর থেকেই তাঁর সঙ্গে পরিবারের আর কোনও যোগাযোগ হয়নি। দিন গড়িয়েছে, মাস কেটেছে, কিন্তু মেয়ের কোনও সন্ধান মেলেনি। এই ছ’মাসে কম চেষ্টা করেননি অমৃতার অসহায় বাবা অর্ধেন্দু সিনহা (Ardhendu Singha)। মেয়ের ছবি সঙ্গে নিয়ে তিনি ঘুরে বেড়িয়েছেন গোটা রাজ্য। কাতর আর্জি জানিয়েছেন প্রশাসনের কাছে। পুলিশের তদন্ত এগোলেও এখনও পর্যন্ত নিখোঁজ অমৃতা। তাই শেষ পর্যন্ত মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর (Suvendu Adhikari) জনতার দরবারে এসে নিজেদের শেষ আশাটুকু দিয়ে আবেদন জানালেন মা- বাবা। জনতার দরবারে গিয়ে মেয়ের কথা বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়েন অর্ধেন্দু ও সুপ্রিয়া। সুপ্রিয়ার আর্জি, তাঁদের মেয়েকে যেন দ্রুত খুঁজে বার করা হয়। পরিবারের আর্থিক টানাপোড়েন এবং তাঁদের শারীরিক সমস্যার কথাও জানান তিনি। পরিবারের কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে অমৃতা বার বার নিজের পায়ে দাঁড়ানোর জন্য কাজ করার কথা ভাবছিলেন। পরিবারের ধারণা, সেই মানসিক চাপ থেকেই হয়তো কোনও সিদ্ধান্ত নিয়ে বাড়ি ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন তরুণী।

আরও পড়ুন: এতো স্পর্ধা! সুপ্রিম নির্দেশের পরেও পড়ুয়াকে নোটিশে ম্যাজিস্ট্রেটকে তীব্র ভর্ৎসনা প্রধান বিচারপতির

পরিবার সূত্রে খবর, নিখোঁজ হওয়ার আগে অমৃতার জীবনেও একের পর এক ধাক্কা এসেছিল। প্রথমে জেঠুর মৃত্যু, তার পর বাবার হৃদ্‌রোগের সমস্যা এবং স্টেন্ট বসানো। একই সময়ে অসুস্থ ছিলেন অমৃতার মাও। একেরপর এক ধাক্কায় মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন তরুণী। তিনি লেখাপড়া করেছিলেন ফার্মেসি নিয়ে। কলেজে ক্লাসও শুরু করেছিলেন। কিন্তু অসুস্থতার কারণে চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি। এরপর থেকেই নিজের পায়ে দাঁড়ানোর জন্য একটি কাজের চেষ্টা করছিলেন অমৃতা। 

১৩ মার্চ বাড়ি থেকে অমৃতার বেরোনোর সময়ও কিছুই বোঝেনি পরিবার। সঙ্গে ছিল না ব্যাগ, অতিরিক্ত পোশাক, মোবাইল ফোন বা পর্যাপ্ত টাকা। বাড়ির হাওয়াই চটি পরে সামান্য টাকা নিয়েই বেরিয়েছিলেন তিনি। তারপর থেকেই নিখোঁজ। মেয়ের সন্ধানে বিভিন্ন জায়গায় কাতর আবেদন অমৃতার মা-বাবার। এর আগে মেয়েকে খুঁজে দেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে উচ্চ শিক্ষামন্ত্রী জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায়ের জনতার দরবারেও পৌঁছে যান অর্ধেন্দু সিনহা। গলায় মেয়ে অমৃতার নাম-ছবি দেওয়া সেই প্ল্যাকার্ড ঝুলিয়ে বৃদ্ধ যান সিউড়ির বিধায়কের দরবারে। এবার মুখ্যমন্ত্রীর কাছে আবেদন সিনহা দম্পতির। ছ’মাস ধরে মেয়ের অপেক্ষায় থাকা অর্ধেন্দু-সুপ্রিয়ার কাছে তাই মুখ্যমন্ত্রীর আশ্বাস এখন বেঁচে থাকার ভরসা। জনতার দরবার থেকে ফিরে তাঁদের একটাই আশা, এ বার হয়তো প্রশাসনের তৎপরতায় অমৃতার সন্ধান মিলবে, শেষ হবে তাঁদের দীর্ঘ অপেক্ষা।