ঝাড়গ্রাম (Jhargram) শহর থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দূরে গোপীবল্লভপুর (Gopibollavpur) ২ নম্বর ব্লকের বালিপাল গ্রাম। চারপাশে ঘন সবুজের আবরণ, শান্ত নিরিবিলি পরিবেশ। আর সেই সবুজের মাঝেই রয়েছে এক প্রাচীন দেবীর থান—মা কেঁদুয়াবুড়ির মন্দির (Kenduabur Temple)। এখানে দুর্গার কোনও মূর্তি নেই। কিন্তু বিশ্বাস, আচার-অনুষ্ঠানে এবং ভক্তির টানে মা কেঁদুয়াবুড়িই দেবী দুর্গা (Durga)। মন্দিরের ভিতরে রয়েছে একটি গর্ভকুণ্ড। তার চারপাশে ছড়িয়ে রয়েছে মাটির হাতি-ঘোড়া। স্থানীয় মানুষের বিশ্বাস, এই স্থানেই অধিষ্ঠান দেবীর। বালিপাল, বাঘাগ্যাড়া, রামচন্দ্রপুর, বড় আসনবনি-সহ আশপাশের প্রায় ৩৫টি গ্রামের মানুষের কাছে এই দেবীই দুর্গারূপে পূজিতা। এখানে একটি বিশেষ প্রথা রয়েছে।
আরও পড়ুন: ছক ভাঙা লেখার স্বীকৃতি, সাহিত্যে নোবেল পেলেন কানাডিয়ান কবি
এলাকার কোনও সর্বজনীন বা পারিবারিক দুর্গাপুজো (Durga Pujo) শুরু করার আগে প্রথমে মা কেঁদুয়াবুড়ির থানে পুজো দেওয়া হয়। শুভকাজের ক্ষেত্রেও একই রীতি চলে আসছে দীর্ঘদিন ধরে। মঙ্গলবার ও শনিবার নিয়ম মেনে দেবীর পুজো হয়। স্থানীয় জনশ্রুতি বলছে, প্রায় পাঁচশো বছর আগে পুরীর এক ক্ষত্রিয় রাজকুমার বলীপালদেব রাজ্যচ্যুত হয়ে এই অঞ্চলে এসে পৌঁছেছিলেন। তখন গোটা এলাকা ছিল কেন্দু গাছে ঘেরা। দীর্ঘ পথ পেরিয়ে ক্লান্ত ও ক্ষুধার্ত রাজকুমার একটি নিমগাছের নীচে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। সেই সময় এক উপজাতি কিশোরীর রূপ ধরে তাঁর সামনে আবির্ভূত হন দেবী। রাজকুমারকে খেতে দেন কেঁদ ফল। পরে স্বপ্নাদেশে তাঁকে জানানো হয়, নিমগাছের নীচের কুণ্ডেই অধিষ্ঠান দেবীর। সেখানে নিয়ম মেনে পুজো করতে হবে।
তবে দেবীর শর্ত ছিল কোনও ছাদ বা মন্দিরের ভিতরে নয়, উন্মুক্ত আকাশের নীচেই হবে তাঁর পুজো। আর সেই পুজোর অধিকার থাকবে বাগদি সম্প্রদায়ের মানুষের হাতে। জনশ্রুতি অনুযায়ী, পরবর্তীকালে দেবীর আশীর্বাদে পরাক্রমশালী রাজা হন বলীপালদেব। তাঁর নাম থেকেই গ্রামের নাম হয় বালিপাল। আর যে কেন্দু গাছের জঙ্গলে দেবীর আবির্ভাব, সেই কেঁদ থেকেই দেবীর নাম হয় কেঁদুয়াবুড়ি। দুর্গা এখানে মূর্তিতে নন, বিশ্বাসে। বালিপালের কেঁদুয়াবুড়ির থানে আজও দুর্গার প্রচলিত মূর্তি দেখা যায় না। দেবীর প্রতীকী উপস্থিতিই এখানে দুর্গারূপে পূজিত হয়। বাগদি সম্প্রদায়ের মানুষ প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে পৌরাণিক আচার-বিধি মেনে এই পুজো করে আসছেন। প্রথা মেনে এখনও বিশেষ আচার হিসেবে হাত চিরে রক্ত দিয়ে দেবীর পুজো সম্পূর্ণ করার রীতি রয়েছে।
স্থানীয় মানুষের কাছে এটি শুধু ধর্মীয় আচার নয়, বরং তাঁদের পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে পাওয়া এক গভীর ঐতিহ্য। প্রায় ৭৯ বছর ধরে বিধি মেনে এখানে দুর্গার আরাধনা হয়ে আসছে বলে স্থানীয়দের দাবি। তবে এই পুজোর শিকড় আরও বহু পুরনো—লোককথা ও বিশ্বাসের পথ ধরে যা প্রায় পাঁচশো বছরের ইতিহাসের সঙ্গে মিশে রয়েছে। প্রতি বছর দুর্গাপুজোর সময় শুধু বালিপাল নয়, আশপাশের প্রায় ৩৫টি গ্রামের মানুষও ছুটে আসেন মায়ের থানে।
কেউ মানত করেন, কেউ মনের কথা জানান, আবার কেউ জীবনের নতুন কোনও শুভ কাজ শুরুর আগে দেবীর আশীর্বাদ নিতে আসেন। শহরের চাকচিক্য থেকে দূরে, ঘন সবুজের মাঝে তাই আজও নিজের মতো করে বেঁচে রয়েছে বালিপালের কেঁদুয়াবুড়ির থান। এখানে দুর্গা মানেই কোনও মূর্তি নয়—দুর্গা মানেই মা কেঁদুয়াবুড়ি। দুর্গাপুজোর ছুটিতে তাই মণ্ডপ পরিক্রমার পাশাপাশি ইতিহাস, লোকবিশ্বাস আর প্রকৃতির টানে ঘুরে আসা যেতে পারে গোপীবল্লভপুরের বালিপাল। যেখানে পাঁচশো বছরের পুরনো এক জনশ্রুতি আজও মানুষের বিশ্বাসে জীবন্ত।















