বাড়ির দুর্গাপুজোর (Durga Pujo) প্রতিমার জন্য নিজের হাতে তৈরি করেছিলেন কয়েকটি গয়না। সেই ছোট্ট উদ্যোগ যে একদিন তাঁকে পরিচিত করে তুলবে, তা হয়তো ভাবেননি বালুরঘাটের (Balurghat) নেপালিপাড়ার (Nepalipara) দেবজ্যোতি মোহরা (Debjyoti Mohra) । বাড়ির পুজো দিয়ে শুরু হওয়া সেই কাজ আজ পৌঁছে গিয়েছে জেলার গণ্ডি পেরিয়ে ভিনরাজ্যে, এমনকি বিদেশের মাটিতেও। তাঁর হাতে তৈরি দুর্গাপ্রতিমার সাজ এখন পুজো উদ্যোক্তাদের কাছে ধীরে ধীরে হয়ে উঠছে আকর্ষণের।

আরও পড়ুন: নোবেলের মঞ্চে ভারতের নীরব কৃতিত্ব, অপটোজেনেটিক্সে JNU- এর সুনীল

২০১৮ সালে নিজের বাড়ির দুর্গাপ্রতিমার জন্য প্রথমবার হাতে গয়না তৈরি করেন দেবজ্যোতি। ছোটবেলা থেকেই বাড়ির পুজোর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি। প্রতিমার কাঠামোয় মাটি দেওয়া থেকে শুরু করে মৃৎশিল্পীর হাতে প্রতিমার সাজ পরানো—সবকিছুই খুব কাছ থেকে দেখেছেন। সেই থেকেই প্রতিমার অলংকার তৈরির প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়। পরে সেই আগ্রহই ধীরে ধীরে পরিণত হয় শিল্পকর্মে।

দেবজ্যোতির কথায়, ২০১৯ সাল থেকে নিয়মিত ভাবে বাড়ির পুজোর প্রতিমার জন্য গয়না তৈরির কাজ শুরু করেন তিনি। নিজের হাতে তৈরি সাজ দেখে পরিচিতদের মধ্যে আগ্রহ তৈরি হয়। এরপর এলাকার বিভিন্ন পুজো কমিটি তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করতে শুরু করে। একের পর এক বরাত আসতে থাকে। বালুরঘাট ছাড়িয়ে কাজের পরিধি পৌঁছে যায় রায়গঞ্জ, শিলিগুড়ি এবং কলকাতায়।

চলতি বছরেও ব্যস্ততা তুঙ্গে। বালুরঘাটের পাশাপাশি কলকাতা, শিলিগুড়ি ও রায়গঞ্জের একাধিক পুজোর প্রতিমার সাজ তৈরি করছেন দেবজ্যোতি। এবার তাঁর কাজের তালিকায় যুক্ত হয়েছে বিহার (Bihar) ও উত্তরপ্রদেশও (UttarPradesh)। সব মিলিয়ে প্রায় ১০ থেকে ১২টি প্রতিমার জন্য গয়না ও অলংকার তৈরির বরাত পেয়েছেন তিনি। দু’বছর আগে তাঁর হাতে তৈরি প্রতিমার গয়না পাড়ি দিয়েছিল সুদূর ক্যালিফোর্নিয়াতেও।

পুজোর আগে হাতে সময় খুবই কম। মহালয়ার আগেই মৃৎশিল্পীদের হাতে পৌঁছে দিতে হবে প্রতিমার সাজ। কারণ প্রতিমা তৈরির শেষ পর্যায়ে গয়না ও অলংকারের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকে। তাই এখন কার্যত দিন-রাত এক করে কাজ চলছে দেবজ্যোতির বাড়িতে। তাঁর সঙ্গে কাজে হাত লাগিয়েছেন আরও পাঁচ-ছয় জন মহিলা। ছেলের কাজে সহযোগিতা করছেন বাবা-মাও। দেবজ্যোতির বাবা নিমাই মোহরা নিজেও শিল্পচর্চার সঙ্গে যুক্ত। তাঁর একটি নিজস্ব স্টুডিও রয়েছে। বয়সের কারণে এখন আগের মতো কাজ করতে না পারলেও ছেলের এই শিল্পকর্মের কাজে তিনি পাশে থাকেন। মা মিতালী মোহরা পেশায় এসএসকে কর্মী। কিন্তু পুজোর মরশুমে ছেলের কাজের চাপ বাড়লে তিনিও নিজের কাজের ফাঁকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন।

মিতালী বলেন, বাড়ির প্রতিমার গয়না তৈরির কাজ থেকে শুরু করে এখন ছেলের তৈরি সাজ বিভিন্ন জায়গায় যাচ্ছে, এটা তাঁদের কাছে অত্যন্ত আনন্দের। পুজোর সময় মণ্ডপে গিয়ে নিজের ছেলের হাতে তৈরি গয়না প্রতিমার গায়ে দেখতে তাঁর ভালো লাগে। ছেলের কাজ আরও দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ুক, সেটাই তাঁর আশা। তবে এ বছর দেরিতে বরাত আসায় ইচ্ছা থাকলেও বেশি কাজ নিতে পারেননি দেবজ্যোতি। হাতে থাকা সময়ের মধ্যেই নির্দিষ্ট সময়ের আগে সমস্ত কাজ শেষ করাই এখন তাঁর মূল লক্ষ্য।

বাড়ির পুজোর প্রতিমার জন্য তৈরি করা সেই প্রথম গয়না থেকে আজ ভিনরাজ্য, এমনকি বিদেশে পৌঁছে যাওয়া—দেবজ্যোতির এই যাত্রা শুধু একজন শিল্পীর সাফল্যের গল্প নয়। এটি দেখিয়ে দেয়, নিজের শিকড়ের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটি ছোট্ট উদ্যোগও নিষ্ঠা, পরিশ্রম আর সৃষ্টিশীলতার হাত ধরে একদিন অনেক দূর পৌঁছতে পারে। তাঁর হাতের তৈরি দুর্গার সাজে তাই শুধু অলংকারের ঝলক নয়, মিশে রয়েছে দীর্ঘদিনের ভালোবাসা, পরিশ্রম এবং নিজের শিল্পকে নতুন পরিচয় দেওয়ার স্বপ্ন।