এতদিন বক্সা শুধু নামেই ব্যাঘ্র প্রকল্প (Buxa Tiger Reserve) ছিল। আগের সরকারকে কটাক্ষ করেই এমনটা বললেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari)। শুক্রবার বক্সা ব্যাঘ্র প্রকল্পে একটি বাঘিনীকে জঙ্গলে ছাড়ার পর আলিপুরদুয়ারের (Alipurduar) সভা থেকে উত্তরবঙ্গের পর্যটন ও বনাঞ্চলকে ঘিরে বড় পরিকল্পনার কথা ঘোষণা করলেন মুখ্যমন্ত্রী। বক্সার জঙ্গলে আসছে আরও বাঘ। আগামী দু’মাসের মধ্যে আরও তিনটি বাঘ ছাড়া হবে জঙ্গলে। শুধু বাঘ নয়, জয়ন্তী (Jayanti) সংলগ্ন প্রায় ২ হাজার একর জমিতে বিশ্বমানের পর্যটনকেন্দ্র তৈরির পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর কথায়, কেন্দ্রীয় বনমন্ত্রী ভূপেন্দ্র যাদবের (Bhupender Yadav) সঙ্গে এই বিষয়ে আলোচনা হয়েছে এবং ওই জমি চিহ্নিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ফলে বাঘের প্রত্যাবর্তনের পাশাপাশি ডুয়ার্সের পর্যটন মানচিত্রেও বড় পরিবর্তনের পরিকল্পনার বার্তা দিয়েছেন তিনি।

মুখ্যমন্ত্রীর কথায়, এতদিন বক্সা শুধু নামেই ব্যাঘ্র প্রকল্প ছিল। এবার সেখানে সত্যিই বাঘের সংখ্যা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রীর কথায়, “আগামী ২ মাসের মধ্যে ওখানে আরও ৩টি বাঘ ছাড়া হবে।” একইসঙ্গে বক্সাকে ঘিরে পর্যটনের পরিকাঠামোও ঢেলে সাজানোর ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি। এদিন বক্সায় সেই পরিকল্পনার প্রথম ধাপ হিসেবেই জঙ্গলে ছাড়া হল একটি বাঘিনী। বিহারের বাল্মীকি টাইগার রিজার্ভ থেকে আনা হয়েছে প্রায় তিন বছরের এই বাঘিনীকে। কেন্দ্রীয় বন মন্ত্রকের অনুমোদনের পরই তাকে বক্সায় আনার প্রক্রিয়া শুরু হয়। বাঘিনীটিকে ধরার কাজও ছিল যথেষ্ট কঠিন। শেষ পর্যন্ত ঘুমপাড়ানি গুলির সাহায্যে তাকে নিরাপদে কাবু করা হয়।

আরও পড়ুন: ভুয়ো চিকিৎসক চিহ্নিত হলেই কঠোর শাস্তি! চার দফা পদক্ষেপ রাজ্যের

এরপর বায়ুসেনার বিশেষ বিমানে করে বাঘিনীটিকে আনা হয় হাসিমারায়। সেখান থেকে বিশেষ কনভয়ে সড়কপথে নিয়ে যাওয়া হয় বক্সা ব্যাঘ্র প্রকল্পে। নতুন পরিবেশে আচমকা ছেড়ে না দিয়ে প্রথমে তাকে এনক্লোজারে রাখা হয়েছিল। বক্সার আবহাওয়া ও পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার পরই জঙ্গলে ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেয় বন দফতর। শুক্রবার মুখ্যমন্ত্রীর সবুজ সঙ্কেতের পর ২৫ মাইল এলাকার গভীর জঙ্গলে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়।

আরও পড়ুন: দেশ গর্বিত আপনার কাজে! আহত পাইলট স্মিতের সঙ্গে ভিডিও কলে কথা প্রধানমন্ত্রীর

বক্সায় বাঘ ফেরানোর পিছনেও রয়েছে নির্দিষ্ট পরিকল্পনা। বন দফতরের নজরদারিতে বক্সার জঙ্গলে মাঝেমধ্যেই বাঘের উপস্থিতির প্রমাণ মিলেছে। একদিকে ভুটানের বনাঞ্চল, অন্যদিকে অসমের জঙ্গল, দু’দিক থেকেই বাঘ বক্সায় ঢোকে বলে বনকর্তাদের পর্যবেক্ষণ। বিশেষ করে পুরুষ বাঘের পায়ের ছাপ এবং ট্র্যাপ ক্যামেরায় তাদের উপস্থিতির ছবি ধরা পড়েছে। সেই কারণেই এবার বক্সায় বাঘিনী আনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। লক্ষ্য, বাইরে থেকে আসা পুরুষ বাঘের সঙ্গে তার প্রজননের সুযোগ তৈরি করা এবং ধীরে ধীরে বক্সার জঙ্গলেই রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারের সংখ্যা বাড়ানো।

একসময় অবশ্য বক্সায় বাঘের উপস্থিতি ছিল অনেক বেশি। বন দফতরের পুরনো তথ্য অনুযায়ী, আশির দশকে বক্সার জঙ্গলে ১০-১২টি বাঘের অস্তিত্বের প্রমাণ মিলেছিল ক্যামেরায়। ২০২৩-২৪ সালের শেষের দিকেও বক্সার জঙ্গলে দু’টি বাঘের দেখা মিলেছিল। সেই হারিয়ে যাওয়া বাঘের আনাগোনাই এবার পরিকল্পিতভাবে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা শুরু হল।

বাঘিনী ছাড়ার পাশাপাশি এদিন বক্সায় স্থানীয় মানুষের সঙ্গেও কথা বলেন মুখ্যমন্ত্রী। রাজাভাতখাওয়া গেটে জনসংযোগ কর্মসূচিতে বনবস্তির বাসিন্দারা নিজেদের নানা সমস্যার কথা তাঁর সামনে তুলে ধরেন। পরে সাফারি গাড়িতে বক্সা পাহাড়ের দিকে যান মুখ্যমন্ত্রী। সেখানে ডুকপা সম্প্রদায়ের মানুষের সঙ্গেও কথা বলেন তিনি। সঙ্গে ছিলেন কেন্দ্রীয় বনমন্ত্রী ভূপেন্দ্র যাদব, রাজ্যের বনমন্ত্রী মনোজ ওঁরাও-সহ অন্যরা। এই উদ্যোগের জন্য বিহারের মুখ্যমন্ত্রী সম্রাট চৌধুরীকেও ধন্যবাদ জানান মুখ্যমন্ত্রী।

আলিপুরদুয়ারের সভা থেকে উন্নয়নের আরও একাধিক পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন তিনি। জেলা আদালতের কাজ প্রস্তুত হয়ে গিয়েছে, শীঘ্রই তার উদ্বোধন হবে বলে জানান মুখ্যমন্ত্রী। পাশাপাশি এলাকায় পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় তৈরির কথাও বলেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, গত কয়েক বছর ধরে সাধারণ মানুষ তাঁদের পাশে রয়েছেন এবং উন্নয়নের মাধ্যমে সেই ‘ঋণ’ শোধ করা হবে।