কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর আসনে থেকে আজ নীরব ধর্মেন্দ্র প্রধান। কিন্তু ২৯ বছর আগে পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস নিয়ে এই ধর্মেন্দ্র প্রধানই আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি কেন্দ্রের শিক্ষামন্ত্রী থাকাকালীনই নিট-ইউজি পরীক্ষার দুবার প্রশ্নফাঁস হল, তারপরেও কেন তিনি পদত্যাগ করছেন না? 

২০২৪। ২০২৬। পরপর দুবার নিট-ইউজির প্রশ্নপত্র ফাঁস হল। এই ঘটনায় শুধুমাত্র ১২-১৩ জন আধিকারিককে সরিয়ে দেওয়া হল। আর বলা হল দোষীদের শাস্তির ব্যবস্থা হবে। যে দেশে নিট-ইউজি প্রশ্নপত্র পাহারা দেওয়ার জন্য জওয়ানদের রাখা হয় সেই দেশের শিক্ষামন্ত্রী এখনও পদে থাকেন কীভাবে? 

১৯৯৭ সালে তখন কংগ্রেস-শাসিত ওড়িশার মুখ্যমন্ত্রী জানকী বল্লভ পট্টনায়েক। ভুবনেশ্বরে মুখ্যমন্ত্রীর বাসভবন থেকে মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরে, পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রতিবাদে রাজ্যের সচিবালয়ের সামনে প্রায় ১,৫০০ শিক্ষার্থী জড়ো হয়েছিলেন। শিক্ষার্থীদের সেই দলেরই নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন বর্তমানের শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান।

আরও পড়ুন: অভিষেকের ব্ল্যাঙ্কেট প্রোটেকশনের আর্জি খারিজ, রাজ্যকে কী নির্দেশ আদালতের

২০২১ সালের একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, জানকী পট্টনায়েকের সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদের (এবিভিপি) সঙ্গে যুক্ত একজন ছাত্রনেতা হিসেবে ভুবনেশ্বরের রাস্তায় নেমেছিলেন প্রধান। এই প্রতিবেদনেই প্রধানের ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে যে, ১৮ বছর বয়সে প্রধান ছাত্র রাজনীতিতে যোগ দেন এবং রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (আরএসএস)-এর ছাত্র সংগঠন এবিভিপি (ABVP)-র একজন সক্রিয় সংগঠক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন।

ধর্মেন্দ্র প্রধান উৎকল বিশ্ববিদ্যালয়ে Anthropology নিয়ে লেখাপড়া করেন এবং ১৯৯৪ সালের নভেম্বর থেকে ১৯৯৭ সালের মধ্যে দুবার এবিভিপি (ABVP)-র জাতীয় সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছিলেন।

১৯৯৭ সালে ওড়িশায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগকে কেন্দ্র করে একটি বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছিল। সে সময় প্রধান এবিভিপি (ABVP)-র জাতীয় সম্পাদক হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন এবং ভারতীয় জনতা পার্টিতে (বিজেপি) আনুষ্ঠানিকভাবে যোগ দেওয়ার কথা চলছিল।

সেই সময় পুলিশ বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়ার আগে পর্যন্ত বিক্ষোভটি শান্তিপূর্ণ ছিল। সে সময় প্রধানকে মারাত্মকভাবে মারধর করেছিল পুলিশ। তাঁর শরীরের কয়েকটি হাড়ও ভেঙে গিয়েছিল। ওই প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেই সময়ে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার কারণে ক্যাম্পাসের নির্বাচনগুলোতে প্রায়ই সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ত। তাঁর একটি নির্বাচনে জয়লাভের সম্ভাবনা স্পষ্ট হয়ে ওঠার পর ‘জনতা দল’-এর সমর্থক হিসেবে চিহ্নিত কিছু ব্যক্তি প্রধানের ওপর হামলা চালিয়েছিল।

ছাত্র রাজনীতিতে কাটানো বছরগুলো বিজেপিতে তাঁর দীর্ঘ সাংগঠনিক কর্মজীবনের ভিত্তি গড়ে দিয়েছিল। ২০২১ সালে শিক্ষামন্ত্রী হওয়ার আগে তিনি কেন্দ্রীয় পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাস মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং দক্ষতা উন্নয়ন ও উদ্যোক্তা বিষয়ক মন্ত্রণালয়েরও দায়িত্বেও ছিলেন।

NEET-UG পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস নিয়ে বর্তমান বিতর্কের জেরে ১৯৯৭ সালের সেই বিক্ষোভটি আবারও জনদৃষ্টির কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে।

মেডিকেল প্রবেশিকা পরীক্ষায় অনিয়মের প্রতিবাদে সম্প্রতি নয়াদিল্লিতে হাজার হাজার শিক্ষার্থী পুলিশের কঠোর পদক্ষেপের মুখে পড়েছে। দিল্লি পুলিশ তরুণ শিক্ষার্থীদের ওপর লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাস প্রয়োগ করলে অন্তত একশ জনেরও বেশি বিক্ষোভকারীকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পুলিশের নির্মমতার শিকার হয়ে আহত হওয়ার পর ২১ বছর বয়সী এক তরুণীকে রাজধানীর একটি নামী হাসপাতালের ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে (আইসিইউ) ভর্তি করা হয়েছে। বিষয়টি রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে, কারণ এই ঘটনা ঠিক সেই কারণটিকেই মনে করিয়ে দেয় যার মাধ্যমে একসময় ধর্মেন্দ্র প্রধান জনসমক্ষে পরিচিতি পেয়েছিলেন।

বিরোধী দলগুলি জোর দাবি জানিয়েছে যে, নিট সংক্রান্ত কোনো আলোচনার আগেই প্রধানের পদত্যাগ করা উচিত। রাজ্যসভায় বিরোধী দলের নেতৃত্বদানকারী কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে যুক্তি দেন, শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের পরেই পরীক্ষা সংক্রান্ত বিতর্ক নিয়ে সুষ্ঠু আলোচনা শুরু হতে পারে।