বাংলার বিধানসভা নির্বাচনে (West Bengal Assembly Election) পালাবদলের পর কেটে গেছে তিন মাসের বেশি সময়। সরকার করেছে বিজেপি। ভোটের আগে বিশেষ নিবিড় ভোটার তালিকা সংশোধন (SIR) প্রক্রিয়ায় বিপুল সংখ্যক বৈধ ভোটারের নাম বাদ যাওয়া নির্বাচনে বড় ফ্যাক্টর হয়েছিল। ফলাফল প্রকাশ পেতেই দেখা যায় অন্তত ৩১টি বিধানসভা কেন্দ্রে জয়ী বিজেপি প্রার্থীদের জয়ের ব্যবধানের তুলনায় ভোটার তালিকা থেকে বাদ যাওয়া ভোটারের সংখ্যা অনেক বেশি। এরপরই সুপ্রিম কোর্টের (Supreme Court) দ্বারস্থ হয় তৃণমূল কংগ্রেস (TMC)। পরিসংখ্যানের ফারাকের কারণে আদালত কি সরাসরি বাংলায় ফের বিধানসভা নির্বাচনে নির্দেশ দিতে পারে? এখন সেই প্রশ্নই ঘোরাফেরা করছে রাজনৈতিক থেকে আইনি মহলে।

দেশের শীর্ষ আদালতের প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত (CJI Surya Kant), বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী এবং বিচারপতি ভি মোহানার সমন্বয়ে গঠিত তিন বিচারপতির ডিভিশন বেঞ্চে মামলাটির শুনানি হয়। তৃণমূলের এক সদস্যের তরফে শীর্ষ আদালতে সওয়াল করেন প্রবীণ আইনজীবী তথা সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় (Kalyan Banerjee)। তাঁর মূল বক্তব্য ছিল, রাজ্যের আদালতে পেশ করা তথ্যে তৃণমূল দাবি করে, বহু আসনে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের ক্ষেত্রে এই ভোটার ছাঁটাই ফলাফলে সরাসরি প্রভাব ফেলেছে। দৃষ্টান্ত হিসেবে ১৪৫ নম্বর বিধানসভা কেন্দ্রের কথা উল্লেখ করে জানানো হয়, সেখানে জয়ের ব্যবধান ছিল মাত্র ৪০১ ভোট, অথচ সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়ায় বাদ দেওয়া হয়েছিল ৮ হাজার ৭৮৫ জন ভোটারের নাম। একই ভাবে আরেকটি কেন্দ্রে ৩১৬ ভোটের ব্যবধানে হার-জিত নির্ধারিত হলেও বাদ পড়া ভোটারের সংখ্যা ছিল কয়েক গুণ।

মামলার শুনানি চলাকালীন আদালতের পর্যবেক্ষণ, বিপুল সংখ্যক নাম বাদ পড়াটাই নির্বাচনে কারচুপির চূড়ান্ত প্রমাণ হতে পারে না। ধরা যাক কোনও কেন্দ্রে জয়ের ব্যবধান ৫০ এবং বাদ পড়েছেন ১০০ জন ভোটার। কিন্তু ওই ১০০ জনের কেউই যদি তাঁদের নাম কাটার বিরুদ্ধে আপত্তি না জানিয়ে থাকেন, তবে সেই যুক্তি তাত্ত্বিক স্তরেই থেকে যায়। পক্ষান্তরে, যদি তাঁদের মধ্যে ৬০ বা ৭০ জনের আপিল এখনও বিচারাধীন থাকে, তবে বিষয়টি গুরুত্ব পায়, বলে মনে করছে শীর্ষ আদালত। আইনি বাধ্যবাধকতার পাশাপাশি ভোটারদের ব্যক্তিগত আপিল নিয়েও প্রশ্ন তোলে বেঞ্চ। বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী (Justice Joymalya Bagchi) জানতে চান, যাঁদের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ গিয়েছে, তাঁদের মধ্যে কতজন নির্বাচন কমিশনের কাছে নাম পুনর্বহালের আবেদন বা আপত্তি জানিয়েছিলেন।তৃণমূলের আইনজীবী জানান, নির্বাচন কমিশন বিধানসভাভিত্তিক আবেদনের তথ্য সর্বসমক্ষে আনেনি। ফলে কতজন ভোটার তাঁদের নাম বাদ পড়ার বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট ভাবে আবেদন জানিয়েছিলেন, সেই তথ্য পাওয়া কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, বর্তমান পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে সত্যিই কি সুপ্রিম কোর্ট পশ্চিমবঙ্গে ফের বিধানসভা নির্বাচন করার নির্দেশ দিতে পারে? শুনানি চলাকালীন প্রধান বিচারপতি জানতে চান, ক্ষতিগ্রস্ত প্রার্থীরা সংশ্লিষ্ট ৩১টি আসনেই আইন মেনে আনুষ্ঠানিক নির্বাচনী মামলা বা ইলেকশন পিটিশন দায়ের করেছেন কি না। তৃণমূলের আইনজীবী জানান, কিছু কেন্দ্রে মামলা হলেও সব আসনে তা করা হয়নি। প্রাথমিকভাবে শীর্ষ আদালতের পর্যবেক্ষণ থেকে স্পষ্ট, স্রেফ পরিসংখ্যানের পার্থক্য দেখে প্রধান বিচারপতি ডিভিশন বেঞ্চ চূড়ান্ত রায় দিতে রাজি নয়। তবে এখনই হাল ছাড়তে নারাজ তৃণমূল। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, পরিস্থিতি কোন দিকে গড়াবে এখনই নিশ্চিত করে কিছু বলা সম্ভব নয়।