The Terminal Man: ১৮ বছরের ঠিকানা বিমানবন্দরের টার্মিনাল থেকেই শেষযাত্রা

ধরা যাক, কেউ বিদেশ যাচ্ছেন কিন্তু মাঝপথে হারিয়ে ফেললেন পাসপোর্ট বা চুরি হয়ে গেল সব পরিচয়পত্র। না ফিরতে পারছেন নিজের দেশে, না যেতে পেরেছেন অন্য কোথাও। এক কথায় দুর্বিষহ পরিস্থিতি। ঠিক এই অদ্ভুত গোলকধাঁধায় আটকা পড়ে একজন মানুষের জীবনের ১৮টি বছর কেটে গিয়েছিল একটি বিমানবন্দরের টার্মিনালে। তিনি মেহরান কারিমি নাসেরি(Mehran Karimi Nasseri)—প্যারিসের শার্ল দ্য গল এয়ারপোর্ট যার কাছে কেবল ট্রানজিট ছিল না, ছিল আস্ত একটা পৃথিবী।
Sponsored

১৯৪৫ সালে ইরানে জন্ম নেওয়া নাসেরির(Mehran Karimi Nasseri) জীবন পাল্টে যায় এক অদ্ভুত আইনি গ্যাঁড়াকলে। রাজনৈতিক কারণে দেশছাড়া হয়ে ইউরোপে আশ্রয়ের খোঁজে ঘুরছিলেন তিনি। বেলজিয়াম থেকে শরণার্থী হিসেবে স্বীকৃতি পেলেও ১৯৮৮ সালে প্যারিসের এক রেলস্টেশনে তাঁর সমস্ত প্রয়োজনীয় কাগজপত্র চুরি হয়ে যায়। ফলাফল? পরিচয়হীন মেহরানকে ফরাসি পুলিশ না পারল দেশে ফেরত পাঠাতে, না পারল ফ্রান্সে ঢোকার অনুমতি দিতে। কাগজপত্র হারালে কি হারিয়ে যায় মানুষের দেশ, পরিচয়, ভবিষ্যৎ? এই প্রশ্নগুলোরই জীবন্ত উত্তর হয়ে উঠল মেহরান কারিমি নাসেরি। এরপর ২৬ অগাস্ট ১৯৮৮ সালে কার্যত 'নো-ম্যানস ল্যান্ড'-এর বাসিন্দা হয়েই নাসেরি আশ্রয় নিলেন চার্লস দ্য গল বিমানবন্দরের টার্মিনাল ১-এ যেখান থেকে বের হতে তার সময় লেগেছিল প্রায় দুই দশক।
পরবর্তী ১৮ বছর নাসেরি কাটিয়েছেন সেই টার্মিনালের দোকান আর রেস্তোরাঁর ধারের একটি প্লাস্টিক বেঞ্চে। পাশে রাখা দু-তিনটি স্যুটকেস আর ব্যাগ ছিল তাঁর পুরো পৃথিবী। বিমানবন্দরের কর্মীরা তাঁকে ভালবেসে ডাকতেন ‘স্যার আলফ্রেড’। তার দিন কাটত অদ্ভুত এক রুটিনে—ডায়েরি লেখা, রেডিও শোনা আর পাইপে ধোঁয়া টানা। খাবারের ঠিকানা ছিল পাশের ম্যাকডোনাল্ডস। অনেক যাত্রী তাঁর জন্য খাবার নিয়ে আসতেন, কেউবা শুধু তাঁর সঙ্গে একটু গল্প করার জন্য লে-ওভারে সময় কাটাতেন। এমনকী স্টিভেন স্পিলবার্গের বিখ্যাত সিনেমা ‘দ্য টার্মিনাল’-এর অনুপ্রেরণাও ছিল নাসেরির এই জীবন। সিনেমাটি তাঁকে বিশ্বজুড়ে খ্যাতি ও অর্থ দুই-ই এনে দিয়েছিল। সেই সিনেমার স্বত্ব থেকে আসা কয়েক লাখ ডলার অবশ্য তাঁর জীবনের গতিপথ বদলাতে পারেনি। তাঁর জীবনের উপর ভিত্তি করে তৈরি হয় ফরাসি চলচ্চিত্র Lost in Transit, একটি অপেরা Flight। নাসেরি নিজেও লেখেন আত্মজীবনী—The Terminal Man।
তবে একসময় নাসেরির জীবনের মোড় ঘুরে যায়। দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পরে আইনি কাগজ পাওয়ার সুযোগ এলেও ততদিনে নাসেরি বিমানবন্দরের সেই কৃত্রিম আলোর জগতটাকেই নিজের ঘর বলে মানতে শুরু করেছেন। তিনি সেই ‘মুক্তি’ নিতে অস্বীকার করেন। শেষ পর্যন্ত ২০০৬ সালে অসুস্থ হয়ে পড়লে তাঁকে জোর করেই হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।
জীবনের শেষ কয়েক বছর প্যারিসের বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে কাটানোর পর, নাসেরি যেন ফের নাড়ির টান অনুভব করলেন সেই বিমানবন্দরের প্রতি। ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে তিনি আবার ফিরে আসেন তাঁর পুরোনো ঠিকানায়—সেই চার্লস দ্য গল এয়ারপোর্টে।
হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে ২০২২ সালের ১২ নভেম্বর, ৭৬ বছর বয়সে টার্মিনাল ২এফ-এ শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এই ‘রাষ্ট্রহীন’ যাযাবর। যে টার্মিনাল তাঁকে বছরের পর বছর বন্দি রেখেছিল, সেই টার্মিনালই হয়ে রইল তাঁর শেষ বিদায়ের সাক্ষী। হাজার হাজার মানুষ প্রতিদিন যেখান দিয়ে গন্তব্যে পৌঁছানোর তাড়ায় ছোটেন, নাসেরি সেখানে কোনো গন্তব্য ছাড়াই থেকে গেলেন চিরকাল।
-
-
-
-
-
Sponsored

Sponsored

Sponsored

Sponsored

Sponsored

Related Articles

আমার নাম কেটেছেন কেন? আখরুজ্জামানকে কুণালের প্রশ্নে ধুন্ধুমার বিধানসভা! টেনে-হিঁচড়ে বের করা হল বেলেঘাটার বিধায়ককে
1h ago

আজ কোথায় কত দাম পেট্রোল-ডিজেলের? দেখে নিন এক নজরে
3h ago

রাস্তা জুড়ে অবৈধ দখলদারি চলবে না, হকারদের সতর্ক করলেন অগ্নিমিত্রা
4h ago

কথা বলতে হলে সরকারকে আসতে হবে যন্তর মন্তরে: CJP
7h ago

পারিবারিক বিবাদের মর্মান্তিক পরিণতি, নিউটাউনে একই পরিবারের মৃত তিন
20h ago

ককরোচদের উপর লাঠিচার্জের প্রতিবাদ করে আটক রাহুল-প্রিয়াঙ্কা-অখিলেশ! মোদির বাসভবনের সামনে উত্তেজনা
21h ago
More from শিরোনাম
View All →
'প্রধানমন্ত্রী সূর্যঘর যোজনা' নিয়ে উপভোক্তাদের সঙ্গে সরাসরি বৈঠক মুখ্যমন্ত্রীর
21h ago

সিকিমে নির্মীয়মাণ টানেলে ধস-গ্যাস বিস্ফোরণ! মৃতের পরিবারকে আর্থিক সাহায্যের ঘোষণা মুখ্যমন্ত্রীর
21h ago

ক্যাথেড্রাল রোডমুখী জনস্রোত, মমতার পথেই জনতা
21h ago

ককরোচদের সঙ্গে অমানবিক আচরণ! জবাব চাইতেই মোদির বাড়ির সামনে বিক্ষোভ রাহুল-প্রিয়াঙ্কাদের
21h ago

শহিদ স্মরণ সভাতেও কংগ্রেসের গোষ্ঠীকোন্দল প্রকাশ্যে! পরিস্থিতি সামাল দিলেন অধীর
23h ago
