যাঁর হাতের ছোঁয়ায় অগুনতি মানুষের হৃদযন্ত্র ফিরে পেয়েছে স্বাভাবিক ছন্দ, সেই প্রখ্যাত ডাক্তার কুণাল সরকারের শরীরেই নিঃশব্দে বাসা বেঁধেছিল হৃদরোগ। সম্প্রতি তাঁরও করাতে হল অ্যানজিওপ্লাস্টি। প্রতিদিন নিয়ম করে ৩০০ থেকে ৪০০ মিটার সাঁতার কাটা, ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং পরিমিত খাদ্যাভ্যাস— কোনও কিছুতেই খামতি ছিল না। এমনকি সাধারণ ইসিজি বা অন্যান্য নিয়মিত শারীরিক পরীক্ষাতেও মেলেনি কোনও সতর্কবার্তা। তবু পারিবারিক ইতিহাস ও নিজস্ব সতর্কতার কারণে শেষ মুহূর্তে ধরা পড়ল ধমনির সমস্যা।
একটি সাক্ষাৎকারে নিজের এই অভিজ্ঞতার কথা অকপটে ভাগ করে নিয়েছেন ডাঃ সরকার। বিশিষ্ট ইন্টারভেনশনাল কার্ডিওলজিস্ট ডাঃ দিলীপ কুমারের তত্ত্বাবধানে তাঁর এই অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হয়েছে। নিজের অসুস্থতা এবং অস্ত্রোপচার নিয়ে অবশ্য স্বভাবসিদ্ধ রসিকতার সুরেই কথা বলেছেন ডাঃ কুণাল। শরীরকে একটি পুরনো বাড়ির সঙ্গে তুলনা করে তাঁর মন্তব্য, বয়সের সঙ্গে সঙ্গে যেমন বাড়ির পলেস্তারা খসে বা সুইচে গোলমাল দেখা দেয়, মানবদেহের ক্ষেত্রেও তেমনই মাঝে মাঝে মেরামতির প্রয়োজন হয়।
চিকিৎসক জানান, হাঁটার চেয়ে সাঁতার কাটতেই তিনি বেশি পছন্দ করেন। অতীতে ইংল্যান্ডে থাকাকালীন চুটিয়ে কাউন্টি লিগে ব্যাডমিন্টন খেললেও বর্তমানের ব্যস্ত রুটিনে তা আর সম্ভব হয় না। তবে সাঁতার এবং কড়া জীবনযাত্রা জারি রেখেও নিজের শারীরিক ঝুঁকির দিকটি সম্পর্কে তিনি সচেতন ছিলেন। কারণ তাঁর পারিবারিক ইতিহাস খুব একটা স্বস্তিদায়ক ছিল না। মাত্র ৫৬ বছর বয়সেই হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গিয়েছিলেন তাঁর বাবা। পরবর্তী কালে কলকাতায় প্র্যাকটিস শুরুর পর তাঁর উচ্চ রক্তচাপের সমস্যা ধরা পড়ে, যা এক সময় পৌঁছেছিল ২১০/১৩০-এর মাত্রায়। পরে রক্তে শর্করার মাত্রাও বাড়ে। সেই কারণেই প্রখ্যাত চিকিৎসক দেবী শেঠীর পরামর্শে নির্দিষ্ট ব্যবধানে সিটি স্ক্যান করাতেন তিনি। কিন্তু কোনও পরীক্ষাতেই বিপদের লক্ষণ স্পষ্ট ছিল না। এমনকি তাঁর ফিটনেস দেখে কার্ডিওলজিস্ট বন্ধুও তাঁকে আশ্বস্ত করে বলেছিলেন, তিনি যে কোনও সুস্থ মানুষের চেয়েও অনেক বেশি ফিট।
কিন্তু আগের পরীক্ষার পর প্রায় তিন বছর কেটে যাওয়ায় শুধুমাত্র নিজের তাগিদেই ফের একবার বিশদ পরীক্ষা করানোর সিদ্ধান্ত নেন ডাঃ সরকার। আর তাতেই ধরা পড়ে, শরীরে কোনও লক্ষণ প্রকাশ না পেলেও নিঃশব্দে একটি ধমনিতে সমস্যা বাড়ছিল। পরীক্ষা রিপোর্ট হাতে পাওয়ার পর তাঁর সেই চিকিৎসক বন্ধুও চমকে উঠে বলেন, “ভাগ্যিস দেখলাম! না হলে তো বেড়ে যেতে পারত।” এর পরেই দ্রুত অ্যানজিওপ্লাস্টির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। আপাতদৃষ্টিতে পুরোপুরি ফিট থাকলেও পারিবারিক ইতিহাস এবং বয়সজনিত ঝুঁকি থাকলে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার প্রয়োজনীয়তা কতটা, নিজের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে সাধারণ মানুষকে সেই বার্তাই দিয়েছেন এই বিশিষ্ট চিকিৎসক।















