সদ্য হইচই-এ স্ট্রিমিং শুরু হয়েছে মিনি সিরিজ ‘ক্যানসেল মি নট’-এর। সিরিজটা ছোট্ট হলেও বেশ জমজমাট। একটি নামী শ্যাম্পুর ব্র্যান্ডের প্রযোজ নায় তৈরি চার পর্বের টানটান গল্প। কোথাও এতটুকু আগ্রহ হারিয়ে ফেলবার অবকাশ নেই। সিরিজের পরিচালক অভিজিৎ চৌধুরী। লিখলেন শর্মিষ্ঠা ঘোষ চক্রবর্তী।

হইচই-এর নতুন মিনি ওয়েব সিরিজ ‘ক্যানসেল মি নট’ (Cancel Me Not)-এর বিষয়বস্তু সমসাময়িক সোশ্যাল মিডিয়া, মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার, বিজ্ঞাপন সর্বস্ব দুনিয়ার ঝাঁ-চকচকে মোড়ক আঁকড়ে ধরে থাকা সেলিব্রিটি থেকে সাধারণ, বর্তমান সময়ের এক অদ্ভুত ক্যান্সেল কালচার, পিআর কালচার, সারাক্ষণ প্রচারে থাকতে গিয়ে ইয়েলো জার্নালিজম, ব্যক্তিগত জায়গা টপকে অন্যের বেডরুমে ঢুকে পড়ার কালচার, গুজব, সেই সঙ্গে কম্পিটিশন মার্কেটে টিকে থাকার লড়াই— এই সবটা নিয়ে। যা বেশ উপভোগ্য। কর্পোরেট দুনিয়ার পিছনের রাজনীতি, টানাপোড়েন, ইনসিকিওরিটির সঙ্গে ব্যক্তি মানুষের গল্পও বলেছে সিরিজটি। পরিচালক অভিজিৎ চৌধুরী। গল্পের গভীরতা বোঝাতে তিনি উল্লেখ করেছেন— সব গল্পেরই একাধিক দিক থাকে। এই গল্পটারও আছে। সত্যি এই গল্পের মধ্যে রয়েছে আরও এক গল্প।

এই গল্পের শুরু দুজন উচ্চাকাঙ্ক্ষী পিআর প্রফেশনাল বা জনসংযোগ পেশায় থাকা রিয়া এবং সানিয়াকে দিয়ে। এই দুই সুন্দরী, স্মার্ট কর্পোরেট নারী একত্রে একটা পি আর এজেন্সি চালায়। সেই এজেন্সির নাম ন্যারেটিভ নাও। এই দুজন আগে কাজ করতেন এক নামকরা বিজ্ঞাপনী সংস্থা পাবলিক ক্যানভাসের সঙ্গে। কিন্তু বাজারে এটাই রটনা যে তাঁদের করা একটা স্ক্যাম ধরা পড়ার ফলে রিয়া এবং সানিয়ার সে এজেন্সি থেকে চাকরি চলে যায়। যদিও বিষয়টা এতদিন তারা গোপনই রেখেছিল। কিন্তু কর্পোরেট দুনিয়ায় কি কিছু চাপা থাকে? এহেন রিয়া এবং সানিয়া নতুন পি আর এজেন্সি খুলেছে এবং স্ট্রাগল করছে। সারাদিন ধরে ক্লায়েন্টের তালিকা তৈরি করে তাঁদের ফোন করে এবং নিজেদের কোম্পানির হয়ে আপ্রোচ করে কিন্তু প্রতিযোগিতার বাজারে যেখানে নামীদামি বিজ্ঞাপনী প্রচার সংস্থার ছড়াছড়ি সেখানে কে আর কাজ দেবে তাঁদের! অর্ধেকের বেশি ক্যান্সেল হয়ে যায়। রিয়া এই নিয়ে একটু নেগেটিভ হলেও সানিয়া কিন্তু আশাবাদী। এই সময় তাঁরা একটি নামী প্রফেশনাল শ্যাম্পুর ব্র্যান্ডের বিজ্ঞাপনী প্রচারের কাজ পায়। কিন্তু তাতে কী! পি আর এজেন্সিকে দাঁড় করাতে গেলে চাই স্ট্রাটেজি, কানেকশনস, মার্কেটে গুড উইল নামজাদা ক্লায়েন্ট যেগুলোর কোনওটাই তাদের নেই। এমতাবস্থায় এক অদ্ভুত সুযোগ আসে তাদের হাতে। যেটা একধরনের চ্যালেঞ্জও বটে। বিনোদন জগতের টপ, সুপারস্টার নীল চ্যাটার্জি যার সুদীর্ঘ ফিল্মি কেরিয়ার এবং ব্যক্তিগত ইমেজে কোনওদিন কেউ একটা কালির দাগ লাগাতে পারেনি তিনি একটি মারাত্মক ও টক্সিক কন্ট্রোভার্সি বা স্ক্যান্ডালে জড়িয়ে পড়েন। যে বিতর্কটা সেই তারকার এতদিনের গড়ে তোলা সফল কেরিয়ার এবং দুর্দান্ত ইমেজকে সম্পূর্ণ ধ্বংসের মুখে এনে ফেলে। এক রাতে একটি হোটেলের রুমে একটি মেয়ের সঙ্গে তিনি সাংবাদিকের ক্যামেরায় ধরা পড়ে যান। শুগার ড্যাডি কালচারের যুগে এমন দৃশ্য কৌতূহল তো জাগায়ই সেই সঙ্গে ক্যামেরার ফ্লাশে, মোবাইলের ভিডিওতেও ধরা পড়ে যায় নীলের ব্যক্তিগত জীবন। মুহূর্তে নীল চ্যাটার্জির সেই ভিডিওটা ভাইরাল হতে শুরু করে। নীল চ্যাটার্জির পার্সোনাল পি আর টিম অনেক চেষ্টা করেও এই ড্যামেজ কন্ট্রোল করতে অক্ষম হয়। নীল এতদিন একচেটিয়া পাবলিক ক্যানভাসের সঙ্গে কোলাবরেশনে ছিলেন কিন্তু এই ঘটনার পর নামজাদা এই পিআর এজেন্সি তার ভাবমূর্তি উদ্ধারের দায়িত্ব নিতে অস্বীকার করে। এই সময় অভিনেতা নীল চ্যাটার্জির ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধার এবং ড্যামেজ কন্ট্রোল করার দায়িত্ব পড়ে রিয়া, সানিয়া এবং তাঁদের পি আর এজেন্সি ন্যারেটিভ নাও-এর ওপর। কেলেঙ্কারি এবং সেই ড্যামেজ কন্ট্রোল করতে নামা দুই পিআর প্রফেশনাল কী কী করেন সেটাই দেখার এই মিনি সিরিজে। একটি তারকার স্ক্যান্ডালের পেছনে কতটা সত্যি আর কতটা পিআর এজেন্সির তৈরি-করা নাটক, কতটা বাইরের আর কতটাই বা ভিতরের খেলা লুকিয়ে আছে সেই রহস্যও খুব সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে এখানে।

সোশ্যাল মিডিয়ার ট্রোলিং, বিভ্রান্তি এবং কর্পোরেট কালচারের জটিল বেড়াজালে সত্য ও মিথ্যার যে লড়াই চলে, তা নিয়েই এই মনস্তাত্ত্বিক ও ড্রামাটিক গল্পের টানটান চিত্রনাট্য এবং সংলাপ লিখেছেন সায়ন্তন ধাড়া। কোথাও এতটুকু বোর হবার অবকাশ নেই। আধুনিক দুই পিআর প্রফেশনাল পার্টনারের কথোপকথন খুব ঝরঝরে, সাবলীল, বাস্তবঘেঁষা। মিনি সিরিজ হওয়ার কারণে গল্পে কোনও বাড়তি একঘেয়েমি টান বা অযথা সময় নষ্ট করা হয়নি, যা দর্শকদের আগ্রহ ধরে রাখতে সাহায্য করবে বলেই মনে হয়। সিরিজটি মুক্তি পাওয়ার পর থেকেই দর্শক মহলে বেশ ইতিবাচক সাড়া ফেলেছে। স্মার্ট প্রেজেন্টেশন জেন জি-দের বেশ ভাল লাগবে তারা নিজেদের সঙ্গে বেশ রিলেট করতে পারবে।

সিরিজের কাস্টিং দুর্দান্ত এটা বলতেই হয়। রিয়া এবং সানিয়ার চরিত্রে অভিনয় করেছেন মোহনা মাইতি এবং রাজনন্দিনী পাল। দুই স্ট্রাগল করা পিআর পার্টনারের কাম বন্ধুর ক্রাইসিস, স্ট্রাটেজি, বুদ্ধি, ব্যর্থতা সবটাই দারুণ ফুটিয়ে তুলেছেন মোহনা এবং রাজনন্দিনী। সুপারস্টার নীল চ্যাটার্জির চরিত্রে সুদীপ খুব সাবলীল এবং ভীষণভাবে যথাযথ। যুধাজিৎ সরকার দারুণ অভিনেতা। যে কোনও চরিত্রেই নিংড়ে ফেলেন নিজেকে তা সে ছোট হোক বা বড়। এছাড়া এই সিরিজে রয়েছেন পূজিতা বন্দ্যোপাধ্যায়, সুদীপ ধাড়া-সহ আরও অনেকে। প্রত্যেকেই নিজের চরিত্রে বেশ সাবলীল অভিনয় করেছেন।