কেউ পেলেন লক্ষাধিক টাকা, কাউকে দেওয়া হল কয়েক কোটি! বাংলার বিধানসভা নির্বাচনে ভোটারদের প্রভাবিত করতে এভাবেই ইউটিউবার থেকে মিডিয়ার একাংশকে টাকা দিয়ে কাজে লাগানোর অভিযোগ বিজেপির (BJP) বিরুদ্ধে। নির্বাচন কমিশনের (ECI) প্রকাশিত তথ্যসূত্র থেকে এটা পরিষ্কার যে একাধিক ইউটিউবার, কনটেন্ট ক্রিয়েটর থেকে শুরু করে মিডিয়ার একাংশকে বড় অঙ্কের টাকা দিয়ে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে নিজেদের হয়ে নির্বাচনী প্রচারে ব্যবহার করেছিল পদ্মদল। বৃহস্পতিবার কমিশনের যে তালিকা প্রকাশ পেয়েছে সেখানে উল্লিখিত নামগুলো দেখলে এটা বুঝতে অসুবিধা হয় না যে পরিকল্পিতভাবে তৃণমূল কংগ্রেস (TMC) বিরোধী দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করতে কীভাবে টাকা খরচ করেছে তৎকালীন বিরোধী তথা রাজ্যের বর্তমান শাসক দল।একদিকে যেমন সায়ক চক্রবর্তী, শমীক অধিকারীদের লক্ষ লক্ষ টাকা দেওয়া হয়েছে ঠিক তার পাশাপাশি নামী মিডিয়া হাউজের এক্সিট পোল প্রভাবিত করতে CNX-কে দেওয়া হয়েছিল ১৮ কোটি। বাংলার মসনদ দখল করতে বিজেপির ম্যানুফ্যাকচারড ন্যারেটিভ এবার প্রকাশ্যে।
আরও পড়ুন: ভোট কমাতেই বিরোধী ঘাঁটিতে ভোটার কাটার চক্রান্ত জ্ঞানেশের! তথ্য পেশ করে বিজেপিকে তোপ সিজেপি-র
মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার কেড়ে নিতে দেশজুড়ে কয়েক কোটি ভোটারের নাম বাদ দিয়েছেন স্বয়ং মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার (Gyanesh Kumar)। বাংলায় ভোটের ঠিক আগে SIR করে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ৯০ লক্ষ নাম বাদ দেওয়ার পরও রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র বন্ধ হয়নি বিজেপির। সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে মানুষকে প্রভাবিত করতে কখনও পার্কস্ট্রিটের নামী রেস্তোরাঁতে গিয়ে গোমাংস খাওয়ানো ঘিরে 'নাটক' আবার কখনও ভোটের আগে থেকেই তৃণমূল বিরোধী হাওয়া ছড়িয়ে দিতে কখনও ডিজিটাল মিডিয়াকে ব্যবহার করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দলের বিরুদ্ধে মিথ্যে অভিযোগ আনা, কুৎসা রটানো এমনকি এক্সিট পোলের নামে পরিকল্পনামাফিক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করা যে ছাব্বিশের নির্বাচনে তৃণমূলকে পরাজিত করে বিজেপি ক্ষমতায় আসতে চলেছে। পার্ক স্ট্রিটের অলি পাবের ঘটনা নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় চর্চায় উঠে এসেছিলেন অভিনেতা তথা কনটেন্ট ক্রিয়েটার সায়ক। তাঁর অভিযোগ ছিল, মাটন স্টেক অর্ডার করার পরেও না জানিয়ে বিফ স্টেক পরিবেশন করা হয়েছিল। সেই সময়ে ঘটনাস্থল থেকে ফেসবুক লাইভ করে বিষয়টিকে ধর্মীয় ভাবাবেগে আঘাত বলে দাবি করেন তিনি। অন্যদিকে, সামাজিক মাধ্যমে ‘ননসেন’ নামে পরিচিত শমীক অধিকারী ভোট আবহে ‘বাটন’ নামে একটি রাজনৈতিক ব্যঙ্গাত্মক ভিডিও তৈরি করে আলোড়ন ফেলেছিলেন। ভিডিওটিতে ব্যালটে সঠিক বোতাম টিপে সরকার বদলের সরাসরি ডাক দেওয়া হয়েছিল।এ রাজ্যের দুই পরিচিত সোশ্যাল মিডিয়া মুখ সায়ক চক্রবর্তীকে আড়াই লক্ষ টাকা এবং শমীক অধিকারীকে ১৩ লক্ষ টাকা দেওয়া হয়েছে। এছাড়াও নির্বাচন কমিশনের তালিকা থেকে স্পষ্ট যে সমাজ মাধ্যমে জনপ্রিয় মুখ RJ প্রিয়াঙ্কা থেকে শুরু করে দিনরাত সোশ্যাল মিডিয়া প্লাটফর্ম ব্যবহার করে বাংলা পোর্টালকে গালমন্দ করা সাংবাদিক পিনাকপানি ঘোষরা ('পিনাক কী বলছে' চ্যানেল) বিজেপির তাঁবেদারি করতে লক্ষ লক্ষ টাকা অ্যাকাউন্টে ভরেছেন। অভিনেতা-কনটেন্ট ক্রিয়েটর সুকান্ত কুণ্ডু আবার টাকা নিয়েছেন কখনও বাবার নামে,কখনও মায়ের নামে। এমনকি 'দ্য ওয়াল' পোর্টালেও নির্বাচনী আবহে একনাগারে তৃণমূল বিরোধিতা লক্ষ্য করা গিয়েছে।
আরও পড়ুন: শক্তি হারিয়ে দুর্বল নিম্নচাপ! দক্ষিণবঙ্গে আজ ঝোড়ো হাওয়ার সঙ্গে হালকা বৃষ্টির পূর্বাভাস
বিজেপির কাছে এটা খুব স্পষ্ট ছিল যে কোনোভাবেই তাঁরা বাংলার মানুষের ভোটে ক্ষমতায় আসার যোগ্যতা রাখে না, সেই কারণে কখনও ব্যাক ডোর পলিটিক্স কখনও ম্যানুফ্যাকচার্ড ন্যারেটিভ তৈরি করে আমজনতার মনে মমতা বিরোধিতা গড়ে তোলার যে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র রচনা করা হয়েছিল আজ নির্বাচন কমিশনের তথ্য প্রকাশে আসতে তা ফাঁস হয়ে গিয়েছে। সংবাদ মাধ্যমকে গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভ বলা হয়, কিন্তু মোদি আমলে মিডিয়ার গ্রহণযোগ্যতা তলানিতে ঠেকে যাওয়ার নেপথ্যে পদ্মদলের হুমকি আর টাকার ঘৃণ্য খেলা লুকিয়ে রয়েছে। বাংলা হান্ট হোক বা আজ বাংলা -বিভিন্ন ডিজিটাল পোর্টাল ও ইউটিউব চ্যানেলগুলিতে অনবরত বিজেপি স্তুতি প্রচারের পরেও এক্সিট পোল প্রভাবিত করতে কোটি কোটি টাকা খরচ করেছে ভারতীয় জনতা পার্টি। এত নির্লজ্জ আচরণ কেন? মমতার জনপ্রিয়তাকে ভয় পেয়ে জোর করে বাংলার ক্ষমতা দখল করা বিজেপির আসল রূপ, রাজ্যে ডবল ইঞ্জিন সরকারের চার মাস যেতে না যেতেই রাজ্যের মানুষের কাছে স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে। পাঁচ রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির মোট খরচ হয়েছে ৫২৯ কোটি টাকা। যার অর্ধেকেরও বেশি, অর্থাৎ প্রায় ২৮৬ কোটি টাকা একাই খরচ হয়েছে পশ্চিমবঙ্গে। বিজেপির দেওয়া হিসেব অনুযায়ী, এ রাজ্যে কেন্দ্রীয় ও রাজ্য নেতৃত্বের দলীয় প্রচারের পিছনেই ব্যয় হয়েছে ২১৭.১৬ কোটি টাকা। পাশাপাশি দলীয় প্রার্থীদের জন্য খরচ দেখানো হয়েছে প্রায় ৭০ কোটি টাকা, যার মধ্যে প্রার্থীদের নির্বাচনী প্রচারের খরচ মেটাতে দলীয় তহবিল থেকেই সরবরাহ করা হয়েছে প্রায় ৬০ কোটি টাকা। অর্থাৎ বোঝাই যাচ্ছে ডিজিটাল মাধ্যম থেকে মাঠ ময়দান—ভোটে ক্ষমতা দখলের লক্ষ্যে তৃণমূলের বিরুদ্ধে নির্লজ্জ অপপ্রচার ও নির্বাচন প্রভাবিত করতে বিপুল অর্থ খরচ করেছে গেরুয়া শিবির।
















