সোমনাথ স্বাভিমান পর্ব: ১০২৬-২০২৬ একহাজার বছরের অবিচ্ছিন্ন বিশ্বাস

নরেন্দ্র মোদি
সোমনাথ- এই নামটি শুনলেই আমাদের হৃদয় ও মনে এক গভীর গর্বের অনুভূতি জাগে। এটি ভারতের আত্মার এক শাশ্বত ঘোষণা। এই মহিমান্বিত মন্দিরটি ভারতের পশ্চিম উপকূলে গুজরাটের প্রভাস পত্তন নামক স্থানে অবস্থিত। দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গ স্তোত্রে ভারতের বারোটি জ্যোতির্লিঙ্গের কথা উল্লেখ আছে। স্তোত্রটি শুরু হয়েছে “সৌরাষ্ট্রে সোমনাথং চ...” দিয়ে, যা প্রথম জ্যোতির্লিঙ্গ হিসেবে সোমনাথের সভ্যতাগত ও আধ্যাত্মিক গুরুত্বকে প্রতীকায়িত করে।আরও বলা হয় :
সোমলিঙ্গং নরো দৃষ্ট্বা সর্বপাপৈঃ প্রমুচ্যতে।
লভতে ফলং মনোবাঞ্ছিতং মৃতঃ স্বর্গং সমাশ্রয়েৎ॥
অর্থ: শুধুমাত্র সোমনাথ শিবলিঙ্গের দর্শন করলেই মানুষ পাপমুক্ত হয়, তাঁর সৎ মনোবাঞ্ছা পূর্ণ হয় এবং মৃত্যুর পর স্বর্গ লাভ করে।
Sponsored

এই সোমনাথ (Somnath), যা লক্ষ লক্ষ মানুষের শ্রদ্ধা ও প্রার্থনা আকর্ষণ করত, তা বিদেশি আক্রমণকারীদের দ্বারা আক্রান্ত হয়েছিল, যাদের উদ্দেশ্য ছিল ধ্বংস, ভক্তি নয়। ২০২৬ সালটি সোমনাথ মন্দিরের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এই মহান তীর্থস্থানে প্রথম আক্রমণের এক হাজার বছর পূর্ণ হচ্ছে। ১০২৬ সালের জানুয়ারি মাসে গজনির মাহমুদ এই মন্দির আক্রমণ করেছিলেন, একটি হিংস্র ও বর্বর আক্রমণের মাধ্যমে বিশ্বাস ও সভ্যতার এক মহান প্রতীককে ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে।
তবুও, এক হাজার বছর পরেও মন্দিরটি আগের মতোই সগৌরবে দাঁড়িয়ে আছে, কারণ সোমনাথকে তার পূর্বের মহিমায় ফিরিয়ে আনার জন্য অসংখ্য প্রচেষ্টা চালানো হয়েছে। এমনই একটি পুনর্নির্মাণের মাইলফলক ২০২৬ সালে ৭৫ বছর পূর্ণ করবে। ১৯৫১ সালের ১১ মে তৎকালীন ভারতের (India) রাষ্ট্রপতি ডঃ রাজেন্দ্র প্রসাদের উপস্থিতিতে একটি অনুষ্ঠানের মাধ্যমে পুনর্নির্মিত মন্দিরটি ভক্তদের জন্য খুলে দেওয়া হয়েছিল।
এক হাজার বছর আগে ১০২৬ সালে সোমনাথের উপর প্রথম আক্রমণ, শহরের মানুষের উপর বর্বর অত্যাচার এবং মন্দির ধ্বংসের কথা বিভিন্ন ঐতিহাসিক বিবরণে অত্যন্ত বিস্তারিতভাবে লিপিবদ্ধ আছে। সেগুলি পড়লে হৃদয় কেঁপে ওঠে। প্রত্যেক লাইনে যাতনা, নিষ্ঠুরতা এবং এমন এক বেদনার ভার রয়েছে যা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ম্লান হতে চায় না।
এটি ভারত এবং তখনকার মানুষের মনোবলকে খুবই প্রভাবিত করেছিল। সর্বোপরি, সোমনাথের একটি বিশাল আধ্যাত্মিক তাৎপর্য ছিল। এটি সমুদ্র উপকূলে অবস্থিত ছিল, যা একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক ক্ষমতার অধিকারী সমাজকে শক্তি যোগাত, যাদের বণিক ও নাবিকরা এর মহিমার কথা দূর-দূরান্তে ছড়িয়ে দিয়েছিল।
তবুও, আমি গর্বের সাথে দ্ব্যর্থহীনভাবে বলতে চাই যে, প্রথম আক্রমণের এক হাজার বছর পরেও সোমনাথের গল্পকে সেই ধ্বংসযজ্ঞ দিয়ে সংজ্ঞায়িত করা যায় নি। এটির অস্তিত্ব ভারতমাতার কোটি কোটি সন্তানের অটুট সাহস দিয়ে সংজ্ঞায়িত।
১০২৬ সালে শুরু হওয়া সেই মধ্যযুগীয় বর্বরতা অন্যদেরকেও সোমনাথকে বারবার আক্রমণ করতে ‘অনুপ্রাণিত’ করেছিল। এটি ছিল আমাদের মানুষ ও সংস্কৃতিকে দাসত্বে আবদ্ধ করার একটি প্রচেষ্টার শুরু। কিন্তু, প্রতিবার যখন মন্দিরটি আক্রান্ত হয়েছে, তখনও আমাদের দেশে এমন মহান পুরুষ ও মহিলারা ছিলেন, যারা এটিকে রক্ষা করার জন্য রুখে দাঁড়িয়েছেন, এমনকি সর্বোচ্চ আত্মত্যাগও করেছেন।আর প্রতিবারই, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে, আমাদের মহান সভ্যতার ধারকরা নিজেদেরকে সামলে নিয়েছেন, মন্দিরটি পুনর্নির্মাণ ও পুনরুজ্জীবিত করেছেন। আমরা ভাগ্যবান যে আমরা সেই একই মাটিতে লালিত হয়েছি যা অহল্যাবাই হোলকারের মতো মহান ব্যক্তিদের লালন করেছে, যিনি ভক্তদের সোমনাথে প্রার্থনা করা সুনিশ্চিত করতে একটি মহৎ প্রয়াস করেছিলেন।
১৮৯০-এর দশকে স্বামী বিবেকানন্দ সোমনাথ পরিদর্শন করেন এবং সেই অভিজ্ঞতা তাঁকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। ১৮৯৭ সালে চেন্নাইতে একটি বক্তৃতার সময় তিনি তাঁর অনুভূতি প্রকাশ করে বলেছিলেন, “দক্ষিণ ভারতের এই পুরোনো মন্দিরগুলি এবং গুজরাটের (Gujrat) সোমনাথের (Somnath) মতো মন্দিরগুলি আপনাকে বিপুল জ্ঞান শিক্ষা দেবে, যেকোনো বইয়ের চেয়েও জাতির ইতিহাস সম্পর্কে আপনাকে গভীরতর অন্তর্দৃষ্টি দেবে। লক্ষ্য করুন, কীভাবে এই মন্দিরগুলি শত শত আক্রমণ এবং শত শত পুনরুজ্জীবনের চিহ্ন বহন করছে, ক্রমাগত ধ্বংস হয়েও ধ্বংসস্তূপ থেকে অবিরাম মাথা তুলে দাঁড়াচ্ছে, পুনরুজ্জীবিত ও আগের মতোই শক্তিশালী হয়ে! এটাই জাতীয় মন, এটাই জাতীয় জীবনধারা। একে অনুসরণ করুন, এটি আপনাকে গৌরবের পথে নিয়ে যাবে। আর একে ত্যাগ করলে ধ্বংস হবে; মৃত্যু হবে একমাত্র ফলাফল, বিলুপ্তি হবে একমাত্র পরিণতি, যে মুহূর্তে আপনি সেই জীবনধারা থেকে সরে যাবেন।”
স্বাধীনতার পর সোমনাথ মন্দির পুনর্নির্মাণের পবিত্র দায়িত্বটি সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলের মতো যোগ্য ব্যক্তির হাতে আসে। ১৯৪৭ সালের দিওয়ালির সময়কার একটি সফর তাঁকে এতটাই আলোড়িত করেছিল যে তিনি ঘোষণা করেন, সেখানেই মন্দিরটি পুনর্নির্মাণ করা হবে। অবশেষে, ১৯৫১ সালের ১১ মে সোমনাথের একটি বিশাল মন্দির ভক্তদের জন্য তার দ্বার উন্মুক্ত হয় এবং ডঃ রাজেন্দ্র প্রসাদ সেখানে উপস্থিত ছিলেন। এই ঐতিহাসিক দিনটি দেখার জন্য মহান সর্দার সাহেব জীবিত ছিলেন না, কিন্তু তাঁর স্বপ্নের বাস্তবায়ন জাতির সামনে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছিল। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু এই ঘটনায় খুব একটা উৎসাহিত ছিলেন না। তিনি চাননি যে মাননীয় রাষ্ট্রপতি এবং মন্ত্রীরা এই বিশেষ অনুষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত হন। তিনি বলেছিলেন যে এই ঘটনা ভারতের সম্পর্কে একটি খারাপ ধারণা তৈরি করেছে। কিন্তু ডঃ রাজেন্দ্র প্রসাদ তাঁর অবস্থানে অটল ছিলেন এবং বাকিটা ইতিহাস। কে এম মুন্সির প্রচেষ্টা স্মরণ না করলে সোমনাথের কোনো আলোচনা সম্পূর্ণ হয় না, যিনি সর্দার প্যাটেলকে অত্যন্ত কার্যকরভাবে সমর্থন করেছিলেন। সোমনাথ নিয়ে তাঁর কাজ, যার মধ্যে ‘সোমনাথ: দ্য শ্রাইন ইটার্নাল’ বইটি অন্তর্ভুক্ত, অত্যন্ত তথ্যবহুল এবং শিক্ষামূলক।
প্রকৃতপক্ষে, মুন্সিজির বইয়ের শিরোনাম যেমনটি প্রকাশ করে, আমরা এমন একটি সভ্যতা যা আত্মা এবং ধারণার অমরত্ব সম্পর্কে একটি দৃঢ় বিশ্বাস বহন করে। আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে যা শাশ্বত তা অবিনশ্বর, যেমনটি গীতার বিখ্যাত শ্লোকে বলা হয়েছে “নৈনং ছিন্দন্তি শস্ত্রাণি…”। সোমনাথের চেয়ে আমাদের সভ্যতার অদম্য চেতনার আর কোনো ভালো উদাহরণ হতে পারে না, যা প্রতিকূলতা ও সংগ্রামকে জয় করে গৌরবের সঙ্গে দাঁড়িয়ে আছে।
এই একই প্রাণশক্তি আমাদের জাতির মধ্যেও দৃশ্যমান, যা শত শত বছরের আক্রমণ ও ঔপনিবেশিক লুণ্ঠন কাটিয়ে বৈশ্বিক অগ্রগতির অন্যতম উজ্জ্বল কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। আমাদের মূল্যবোধ এবং জনগণের দৃঢ় সংকল্পই আজ ভারতকে বিশ্ববাসীর মনোযোগের কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। বিশ্ব আজ ভারতকে আশা ও আশাবাদের চোখে দেখছে। তাঁরা আমাদের উদ্ভাবনী তরুণদের কর্মযজ্ঞে অর্থবিনিয়োগ করতে চায়। আমাদের শিল্প, সংস্কৃতি, সঙ্গীত এবং বিভিন্ন উৎসব বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে। যোগ ও আয়ুর্বেদ বিশ্বব্যাপী প্রভাব ফেলছে এবং সুস্থ জীবনযাপনে উৎসাহিত করছে। বিশ্বের সবচেয়ে জরুরি কিছু সমস্যার সমাধান আসছে ভারত থেকে।
অনাদিকাল থেকে সোমনাথ বিভিন্ন স্তরের মানুষকে একত্রিত করেছে। শত শত বছর আগে, শ্রদ্ধেয় জৈন সন্ন্যাসী কালিকাল সর্বজ্ঞ হেমচন্দ্রাচার্য সোমনাথে এসেছিলেন। কথিত আছে, সেখানে প্রার্থনা করার পর তিনি একটি শ্লোক আবৃত্তি করেছিলেন, “ভববীজাঙ্কুরজননা রাগাঘাঃ ক্ষয়মুপগতা যস্য।” এর অর্থ - "তাঁকে প্রণাম, যাঁর মধ্যে পার্থিব অস্তিত্বের বীজ ধ্বংস হয়ে গেছে, যাঁর মধ্যে আসক্তি এবং সমস্ত ক্লেশ বিলীন হয়ে গেছে।" আজও সোমনাথ মন ও আত্মার গভীরে কিছু গভীর অনুভূতি জাগিয়ে তোলার সেই একই ক্ষমতা রাখে।
১০২৬ সালের প্রথম আক্রমণের হাজার বছর পরেও সোমনাথের সমুদ্র আজও সেই একই তীব্রতায় গর্জন করে। সোমনাথের তীরে আছড়ে পড়া ঢেউগুলো একটি গল্প বলে। যাই ঘটুক না কেন, ঢেউগুলোর মতোই এটি বারবার মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে।
অতীতের আক্রমণকারীরা এখন বাতাসে ধূলিকণা, তাদের নাম ধ্বংসের সমার্থক। তারা ইতিহাসের পাতায় পাদটীকায় পরিণত হয়েছে, আর সোমনাথ উজ্জ্বল হয়ে দিগন্ত ছাড়িয়ে আলো ছড়াচ্ছে, যা আমাদের সেই শাশ্বত চেতনার কথা মনে করিয়ে দেয় যা ১০২৬ সালের আক্রমণেও অম্লান ছিল। সোমনাথ হলো আশার এক গান, যা আমাদের বলে যে ঘৃণা ও ধর্মান্ধতা হয়তো এক মুহূর্তের জন্য ধ্বংস করার ক্ষমতা থাকতে পারে, কিন্তু মঙ্গলের শক্তিতে বিশ্বাস ও আস্থার ক্ষমতা রয়েছে অনন্তকাল ধরে সৃষ্টি করার।
যদি হাজার বছর আগে আক্রান্ত এবং তারপর থেকে ক্রমাগত আক্রমণের শিকার হওয়া সোমনাথ মন্দির বারবার পুনরুজ্জীবিত হতে পারে, তবে আমরাও নিশ্চয়ই আমাদের মহান জাতিকে সেই গৌরবে ফিরিয়ে আনতে পারব, যা হাজার বছর আগে আক্রমণের পূর্বে তার মধ্যে মূর্ত ছিল। শ্রী সোমনাথ মহাদেবের আশীর্বাদে, আমরা একটি উন্নত ভারত গড়ার নতুন সংকল্প নিয়ে এগিয়ে চলেছি, যেখানে সভ্যতার জ্ঞান আমাদের সমগ্র বিশ্বের কল্যাণের জন্য কাজ করতে পথ দেখাবে।
জয় সোমনাথ!
(লেখক ভারতের প্রধানমন্ত্রী ও শ্রী সোমনাথ ট্রাস্টের চেয়ারম্যান)
Sponsored

Sponsored

Sponsored

Sponsored

Sponsored

Related Articles

ক্ষমা চান প্রধানমন্ত্রী: শিক্ষা দুর্নীতি থেকে ছাত্র আন্দোলনে পুলিশি হামলা- কেন্দ্রকে তুলোধনা রাহুলের
8h ago

চাপের মুখে নিট প্রশ্ন ফাঁস-কাণ্ডে সংসদে আলোচনায় রাজি কেন্দ্র!
10h ago

সিজেপির সংসদ অভিযানে পুলিশের হামলা! দ্রুত শুনতেও চাইল না সুপ্রিম কোর্ট
10h ago

শিক্ষামন্ত্রীর ইস্তফার দাবিতে কালো পোশাক পরে সংসদ ভবনের বাইরে বিক্ষোভ সাংসদদের
13h ago

দেখে নিন আজকের সোনা রুপোর দর এক নজরে
13h ago

আজ কোথায় কত দাম পেট্রোল-ডিজেলের? দেখে নিন এক নজরে
13h ago
More from দেশ
View All →
অসমে গুরুতর বন্যা পরিস্থিতি, জলের তোড়ে ভেসে গেল একই পরিবারের ৫ সদস্য!
15h ago

সিকিমের সুড়ঙ্গ বিপর্যয়ে বাড়তে পারে মৃতের সংখ্যা, বুধের সকালেও চলছে উদ্ধারকাজ
17h ago

কথা বলতে হলে সরকারকে আসতে হবে যন্তর মন্তরে: CJP
17h ago

ককরোচদের উপর লাঠিচার্জের প্রতিবাদ করে আটক রাহুল-প্রিয়াঙ্কা-অখিলেশ! মোদির বাসভবনের সামনে উত্তেজনা
1d ago

‘নেতা-মন্ত্রীরা নিজেদের ভগবান মনে করছেন? ছাত্র-বিক্ষোভে লাঠিচার্জে কেন্দ্রের বিরুদ্ধে গর্জে উঠলেন অরিজিৎ
1d ago
