স্ট্যান্ডিং কমিটি (Standing Committee) থেকে সরানো হল তৃণমূল কংগ্রেস সাংসদ দোলা সেনকে (Trinamool Congress MP Dola Sen)। আর এই সিদ্ধান্ত ঘিরেই কেন্দ্রের বিরুদ্ধে সরাসরি রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ তুললেন তৃণমূল সাংসদ। তাঁর দাবি, সংসদীয় স্ট্যান্ডিং কমিটির চেয়ারম্যান পদ নিয়েও বিরোধীদের প্রতি কেন্দ্রের আচরণ বারবার বদলেছে রাজনৈতিক সমীকরণ অনুযায়ী। ২০১৪ থেকে ২০১৯—নরেন্দ্র মোদি সরকারের (Narendra Modi government) প্রথম মেয়াদে বিরোধী সাংসদদের লোকসভা ও রাজ্যসভার বিভিন্ন স্ট্যান্ডিং কমিটির চেয়ারম্যান করা হয়েছিল। তৃণমূল কংগ্রেসের সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় এবং ডেরেক ও’ব্রায়েনও (Derek O'Brien) সেই দায়িত্ব পেয়েছিলেন। কিন্তু ২০১৯-এর পর পরিস্থিতি বদলে যায় বলে অভিযোগ দোলা সেনের। তাঁর দাবি, ডেরেক ও’ব্রায়েন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে থাকার কারণেই তাঁকে আর কোনও স্ট্যান্ডিং কমিটির চেয়ারম্যান করা হয়নি। এরপর ২০২১-এর পর সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়কেও একইভাবে চেয়ারম্যান পদ থেকে সরানো হয় বলে তাঁর দাবি।
এদিন দোলা সেন জানান, ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের পর বিজেপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়ে ২৪০টি আসনে থেমে যায়। সেই পরিস্থিতিতে বিরোধী দলগুলিকে একাধিক সংসদীয় স্ট্যান্ডিং কমিটির চেয়ারম্যান পদ দিতে বাধ্য হয়েছিল কেন্দ্র। তৃণমূলের কীর্তি আজাদ লোকসভায় এবং দোলা সেন-সহ বিরোধী সাংসদরা রাজ্যসভায় গুরুত্বপূর্ণ কমিটির দায়িত্ব পান। দোলা সেন নিজে পান কমার্স সংক্রান্ত স্ট্যান্ডিং কমিটির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব—যেটিকে তিনি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সংসদীয় কমিটি বলে উল্লেখ করেছেন। তাঁর বক্তব্য, এবার সেই দায়িত্ব থেকেও তাঁকে সরানো হয়েছে। ‘'আমরা অবাক হইনি। সংসদীয় কমিটিগুলির চেয়ারম্যান পদ নিয়েও নিঃসন্দেহে রাজনৈতিক আনুগত্যের প্রভাব রয়েছে।''
এদিকে ‘অবৈধ’ নির্বাচনের অভিযোগ তুলে কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়্গের নির্বাচন বাতিলের দাবির প্রসঙ্গেও মুখ খুলেছেন দোলা সেন। তাঁর দাবি, এই ইস্যু নিয়ে INDIA জোটের অন্দরে আলোচনা হয়েছে এবং তৃণমূলও দীর্ঘদিন ধরে বিষয়টি নিয়ে সরব। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও (Mamata Banerjee) দীর্ঘদিন ধরে এই অভিযোগ তুলে আসছেন। তৃণমূলের সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ও (Abhishek Banerjee) আগে সীমা খান্নাকে ঘিরে বিষয়টি তুলেছিলেন। ২০২৩ সালে ডিসেম্বরের সংসদীয় অচলাবস্থার প্রসঙ্গও তুলে ধরেন দোলা সেন। তাঁর দাবি, সেই সময় লোকসভা ও রাজ্যসভা মিলিয়ে ১৪৭ জন সাংসদকে সাসপেন্ড করে সংসদ থেকে বের করে দেওয়া হয়েছিল এবং তারপরেই সংশ্লিষ্ট বিল একতরফাভাবে পাস করা হয়। ওই ব্যবস্থায় প্রধানমন্ত্রী, বিরোধী দলনেতা এবং প্রধানমন্ত্রীর মনোনীত একজন মন্ত্রীকে নিয়ে তিন সদস্যের কমিটি তৈরি করা হয়। ফলে কার্যত ২:১ সংখ্যাগরিষ্ঠতার কাঠামো তৈরি হয়। এই প্রসঙ্গেই বর্তমান মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের নিয়োগ নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তৃণমূল সাংসদ। তাঁর অভিযোগ, এই ২:১ ব্যবস্থার মাধ্যমেই জ্ঞানেশ কুমারকে নিয়ে আসা হয়েছিল।
প্রসঙ্গত, এই বিষয়ে ডেরেকের বক্তব্য, ২০১৯ সালেও রাজ্যসভায় তৃণমূল তৃতীয় বৃহত্তম দল থাকা সত্ত্বেও তাঁদের চেয়ারম্যান পদ থেকে বঞ্চিত করা হয়েছিল। পরে সেই সিদ্ধান্ত সংশোধন করা হলেও, তাঁর অভিযোগ, এবার ফের একই পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি হয়েছে। চিঠিতে এর পাশাপাশি সংসদীয় কার্যপ্রণালী নিয়েও একাধিক পরিসংখ্যান তুলে ধরেছিলেন ডেরেক। তাঁর দাবি, ২০০৪ থেকে ২০০৯-এর মধ্যে ১০টি বিলের মধ্যে ৬টি কমিটির কাছে বিস্তারিত পর্যালোচনার জন্য পাঠানো হয়েছিল। ২০১৯ থেকে ২০২৪-এর মধ্যে সেই সংখ্যা কমে দাঁড়ায় ১০টির মধ্যে মাত্র ২টিতে। বিল পাশের প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। ডেরেকের দাবি ছিল, বর্তমানে প্রতি ১০টি বিলের মধ্যে প্রায় ৪টি অর্ডিন্যান্স হিসেবে পাশ হচ্ছে। প্রায় ২০ বছর আগে এই সংখ্যা ছিল ১০টির মধ্যে ২টি। সব মিলিয়ে স্ট্যান্ডিং কমিটি থেকে দোলা সেনের অপসারণের ঘটনাকে সামনে রেখে ফের একবার সংসদীয় প্রতিষ্ঠানে বিরোধীদের ভূমিকা, কমিটির চেয়ারম্যান নির্বাচন এবং নির্বাচন কমিশনের নিয়োগ-প্রক্রিয়া নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক তীব্র হল। তৃণমূলের অভিযোগ, সংসদীয় গণতন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ নজরদারি ব্যবস্থাগুলিতেও রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ বাড়ছে।















