বাল্যবিবাহের অভিশাপ ও সামাজিক লাঞ্ছনা জয় করে বিহারের কিশাণগঞ্জের রোশনি পারভীন আজ শত শত মেয়ের কাছে এক রক্ষাকর্তার নাম। মাত্র ১৩-১৪ বছর বয়সে নিজের বয়সের চেয়ে তিন গুণ বড় এক পুরুষের সঙ্গে জোরপূর্বক বিয়ের শিকার হওয়া এই তরুণী, সমস্ত সামাজিক অপবাদ ও ‘characterless’ বা ‘চরিত্রহীন’ তকমা পায়ে ঠেলে এখনও পর্যন্ত ৬০টিরও বেশি বাল্যবিবাহ রুখে দিয়েছেন। তাঁর এই অসামান্য সাহসী লড়াইয়ের জন্য তিনি সুইজারল্যান্ডের জেনিভায় রাষ্ট্রপুঞ্জের (UN) মর্যাদাপূর্ণ ‘Young Activists Summit’-এ ভারতের একমাত্র প্রতিনিধি হিসেবে আমন্ত্রিত ও সম্মানিত হয়েছেন। 

আরও পড়ুন: মাত্র ১ টাকায় কেল্লাফতে! মিলবে ২৪ দিনের আনলিমিটেড কলিং ও প্রতিদিন ১ জিবি ডেটা

বিহারের কিশাণগঞ্জ ব্লকের সিমালবাড়ি গ্রামের বাসিন্দা রোশনি যখন নবম শ্রেণিতে পড়তেন, তখন থেকেই তাঁর ওপর বিয়ের চাপ আসতে শুরু করে। নিজের প্রবল আপত্তি সত্ত্বেও মাত্র ১৪ বছর বয়সে তাঁকে বিয়ে দিয়ে দেওয়া হয় এক ৪৫ বছর বয়সি প্রৌঢ়ের সঙ্গে। বিয়ের পর শ্বশুরবাড়িতে শুরু হয় চরম শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন। মাত্র ১৫ বছর বয়সে তিনি এক সন্তানের জন্ম দেন এবং অবর্ণনীয় অত্যাচারের হাত থেকে বাঁচতে শিশুসন্তানকে নিয়ে শ্বশুরবাড়ি ছেড়ে পালিয়ে নিজের বাবার বাড়িতে ফিরে আসেন। 

আরও পড়ুন: পঞ্জাবে গুলি করে খুন LGBTQ+র প্রতিনিধি ইনফ্লুয়েন্সার ম্যাড সান্ধু, স্যোশাল মিডিয়ায় দায় স্বীকার

অত্যাচারী স্বামীর ঘর ছেড়ে পালিয়ে আসার পর রোশনির লড়াই আরও কঠিন হয়ে ওঠে। সমাজ ও নিজের চারপাশের মানুষ তাঁকে আশ্রয় দেওয়া তো দূর অস্ত, উলটে তাঁর দিকেই আঙুল তোলে। অত্যাচার সহ্য না করে প্রতিবাদ করায় তাঁকে সমাজে ‘চরিত্রহীন’ বলে দেগে দেওয়া হয়। রোশনির কথায়, “যেহেতু আমি নিজের সংসার বাঁচাতে পারিনি, তাই সমাজ ভাবত আমি অন্য কোনো মেয়েরও সংসার হতে দিতে চাই না। আমাকে অনবরত কটূক্তি ও লাঞ্ছনা সহ্য করতে হয়েছে।” কিন্তু এই অপমানই তাঁকে অন্য মেয়েদের জীবন বাঁচানোর জেদ জুগিয়েছিল।

আরও পড়ুন: যাত্রীদের নিয়ে বিমান ধ্বংসই লক্ষ্য ছিল! ককপিটে কুঠার-হানার ঘটনায় স্বীকারোক্তি ওমানের পাইলটের

প্রতিরোধ গড়ে তোলার অভিনব কৌশল

২০১৮ সালে রোশনি প্রথম Childline India Foundation-এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে সমাজকর্মী হিসেবে কাজ শুরু করেন। পরবর্তীতে তিনি ইউনিসেফ (UNICEF) ও সেভ দ্য চিলড্রেন-এর মতো আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গেও কাজ করেন। তাঁর কাজের প্রধান হাতিয়ারগুলি হলো: 

কিশোরী বাহিনী গঠন: গ্রামীণ বিহারে রোশনি ১৫টি কিশোরী দল বা ‘Adolescent Girls Groups’ তৈরি করেছেন। এই মেয়েরাই গ্রামে কোনো নাবালিকার বিয়ের তোড়জোড় চললে গোপনে রোশনিকে খবর দেয়। 

প্রশাসনিক তৎপরতা: খবর পাওয়ামাত্রই রোশনি পুলিশ, জেলা শাসক ও ব্লক প্রশাসনের সাহায্য নিয়ে সরাসরি বিয়ের মণ্ডপে হাজির হয়ে যান। প্রয়োজনে পরিবারের বিরুদ্ধে FIR দায়ের করার আইনি হুঁশিয়ারিও দেন। 

কাউন্সেলিং: শুধুমাত্র আলোচনার মাধ্যমে ও বাল্যবিবাহের ভয়াবহ কুফল বুঝিয়ে তিনি বহু পরিবারকে এই অপরাধ থেকে বিরত করেছেন। 

আরও পড়ুন: পুজোর আগেই বিদায় নেবে ব্রণ! এই ৪টি ভুল শুধরে নিলেই মুশকিল আসান

স্বনির্ভরতার নতুন দিগন্ত

রোশনি বিশ্বাস করেন, মেয়েদের পড়াশোনা ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতা না থাকলে বাল্যবিবাহ পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব নয়। তাই তিনি তাঁর গঠিত ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে উদ্ধার হওয়া মেয়েদের স্কুলছুট হওয়া থেকে বাঁচাচ্ছেন এবং তাদের সেলাই বা বিউটি পার্লারের মতো বৃত্তিমূলক কাজের মাধ্যমে স্বনির্ভর করে তুলছেন। পাশাপাশি দরিদ্র পরিবারগুলিকে সরকারি রেশন ও বাসস্থানের সুবিধার সঙ্গে যুক্ত করার কাজও করছেন তিনি। 

আরও পড়ুন: বর পাওয়া যায় এই মেলায়! ৭০০ বছরের ঐতিহ্য আজও বহমান বিহারে

বিশ্বমঞ্চে ভারতের রোশনি

নিজের জীবনের অন্ধকার পেরিয়ে অন্য মেয়েদের জীবনে আলো ফেলার এই অদম্য জেদ রোশনিকে আন্তর্জাতিক পরিচিতি এনে দিয়েছে। রাষ্ট্রপুঞ্জের জেনিভা সদর দপ্তরে সারা বিশ্বের মাত্র ৬ জন যুব অ্যাক্টিভিস্টের মধ্যে ভারতের একমাত্র প্রতিনিধি হিসেবে রোশনিকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। সেখানে তিনি ভারত ও তার সীমান্তবর্তী এলাকার বাল্যবিবাহের বাস্তব চিত্র এবং তার বিরুদ্ধে নিজের লড়াইয়ের অভিজ্ঞতার কথা বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরেন। 

রোশনির এই রূপান্তর একাধারে যেমন সমাজের পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতার গালে চড়, তেমনই তা ভারতের হাজার হাজার নিপীড়িত নাবালিকার কাছে প্রতিবাদের এক নতুন অনুপ্রেরণা।