শুধু ভোটচুরি নয়, ঘুষকাণ্ডেও জড়িয়েছিল জ্ঞানেশ কুমারের নাম। কেরলে বড়মাপের দুর্নীতিতে অভিযোগের আঙুল উঠেছিল জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে। নির্বাচন কমিশনের সর্বোচ্চ পদে বসে ভোট চুরি করার অভিযোগের মাঝেই এবার ভারতের বর্তমান মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের আরও এক কেলেঙ্কারি ফাঁস। কেরল সরকারের পূর্তসচিব থাকাকালীন ২০০৬ সালে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে। শুধু তাই নয়, এক মালয়েশীয় ঠিকাদারের আত্মহত্যার বিতর্কেও নাম জড়িয়েছিল তাঁর নাম। লি বিন সিন নামে ওই মালয়েশীয় কর্মকর্তা ২০০৬ সালের নভেম্বরে কেরল থেকে ফেরার পরে কুয়ালা লামপুরে আত্মহত্যা করেছিলেন। তাঁরই সুইসাইড নোটে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছিল জ্ঞানেশ কুমারের নাম। জ্ঞানেশ-সহ পূর্ত বিভাগের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অব্যবস্থা এবং হয়রানির অভিযোগ এনেছিলেন তিনি তাঁর সুইসাইড নোটে। ২০ বছর আগের এই ঘটনা প্রকাশ্যে এনেছেন কেরলের সেই সময়ের অর্থমন্ত্রী টি এম এস আইজ্যাক। সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টে তিনি বিষয়টি তুলে ধরার সঙ্গে সঙ্গেই বিভিন্ন মহলে পড়ে গিয়েছে ব্যাপক আলোড়ন।  

১৯৮৮ ব্যাচের কেরল ক্যাডারের আইএএস অফিসার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে ঘুষ চাওয়ার অভিযোগ করেছিলেন মালয়েশিয়ার ওই প্রকৌশলী ও কর্মকর্তা লি বেন সিন। জানা গিয়েছে, ২০০৬ সালে কেরলের একটি রাস্তা প্রকল্পের যৌথ উদ্যোগের দায়িত্বে ছিলেন তিনি। কেরল থেকে ফিরে আসার পর ওই বছরের নভেম্বরে তিনি আত্মহত্যা করেন এবং সুইসাইড নোটে স্পষ্ট করে কেরলের পূর্ত বিভাগের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে চরম হয়রানি, অর্থ প্রদানে বিলম্ব এবং ঘুষ চাওয়ার অভিযোগ করেন। যেখানে নাম ছিল জ্ঞানেশ কুমারেরও। অর্থাৎ নির্বাচন কমিশনের সর্বোচ্চ পদে বসেই যে তিনি শুধু দুর্নীতি করছেন তা নয়, অভিযুক্ত জ্ঞানেশের অপরাধমূলক কার্যকলাপের সঙ্গে যুক্ত থাকার ইতিহাস বহু পুরনো।

আজ থেকে বছর কুড়ি আগে কেরালার পূর্ত বিভাগের দুর্নীতি প্রকাশ্যে আসতে তুমুল রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়। তৎকালীন ভি এস অচ্যুতানন্দনের নেতৃত্বাধীন বামপন্থী সরকার এলডিএফ ২০০৬ সালের নভেম্বর মাসেই জ্ঞানেশকে পূর্ত সচিবের পদ থেকে সরিয়ে অন্যত্র বদলি করে। কেরালা সরকার তদন্তের নির্দেশ দিলেও প্রশাসনিক অনীহার কারণে সেই তদন্ত আর গতি পায়নি ফলে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়নি। শুক্রবার কেরলের প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী টমাসের পোষ্টের ভিত্তিতে করা অভিযোগের জেরে নির্বাচন কমিশনের পর থেকে জ্ঞানেশকে সরানোর দাবি আরও জোরালো হয়েছে বলেই মনে করা হচ্ছে। আইজ্যাক অভিযোগ করেছেন যে কেরল-কাণ্ডে জ্ঞানেশ কুমারের দুর্নীতি প্রকাশ্যে আসার অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনে চলে যান। এবং তৎকালীন প্রতিরক্ষা মন্ত্রী তথা কংগ্রেস নেতা অ্যান্টনির ইচ্ছায় প্রথমে প্রতিরক্ষা মন্ত্রকে যোগ দেন। পরবর্তীতে ২০১২ সালে কেরল হাউসের রেসিডেন্ট কমিশনারের দায়িত্ব দেওয়া হয় জ্ঞানেশকে। ২০১৬ সালে কেরালায় বাম সরকার ক্ষমতায় আসতেই কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনে কাজ করতে ফিরে যান বর্তমান মুখ্য নির্বাচন কমিশনার। ৩৭০ ধারা বাতিলের আগে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের তৈরি টিমের বিশেষ দায়িত্ব দেওয়া হয় তাঁকে। কী কাজ ছিল সেখানে? জানা গিয়েছে সংবিধানের অনুচ্ছেদের ফাঁকফোকর খুঁজে বের করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল সেই দলকে এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বিশেষ অনুগত আর বিশ্বস্ত জ্ঞানেশ যে নিজের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে খুশি করতে পেরেছিলেন তা বলাই বাহুল্য। এরপরই ২০২৫ সালে তাঁকে প্রাইজ পোস্টিং দেওয়া হয় মুখ্য নির্বাচনী কমিশনার পদে বহাল করে। টমাস স্পষ্ট অভিযোগ করেছেন জম্মু-কাশ্মীরে ৩৭০ ধারা তুলে নেওয়ার ক্ষেত্রে যে সরকারি সিদ্ধান্ত সেই প্রক্রিয়ায় জ্ঞানেশের প্রত্যক্ষ ভূমিকা ছিল। 

মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের কর্মজীবনের প্রতিটা ধাপে যেভাবে দুর্নীতির ইতিহাস জড়িয়ে রয়েছে এবং মোদি সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে যেভাবে কেন্দ্রের মদত পেয়েছেন তিনি তাতে ইচ্ছাকৃতভাবে এসআইআর প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বৈধ ভোটারদের নাম বাদ দেওয়ার নেপথ্যে লুকিয়ে থাকা বড় মাথার ইঙ্গিত পাওয়া খুব একটা কঠিন নয়। সিজেপির দেওয়া ৪৮ ঘণ্টার আল্টিমেটাম শেষ হচ্ছে আজ। একজোট হচ্ছে বিরোধীরা। এখন দেখার, জ্ঞানেশকে নিয়ে কী সিদ্ধান্ত নেয় কেন্দ্র সরকার।