এসআইআর (SIR) বিতর্কে কমিশনের অন্দরের টানাপোড়েন ঢাকতেই কি এই বৈঠক? দুই নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু (Sukhbir Singh Sandhu) ও বিবেক যোশীর (Vivek Joshi) একাধিক আপত্তি ঘিরে যখন নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন উঠছে, ঠিক তখনই মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের (Gyanesh Kumar) সঙ্গে একই টেবিলে বৈঠকে বসলেন দুই কমিশনার। শনিবারের সেই বৈঠকের ছবি প্রকাশ করে কার্যত জনসমক্ষে ‘ঐক্য’র বার্তাই দিতে চাইল কমিশন। কিন্তু বৈঠকের এই বার্তা কি সত্যিই মুছে দিতে পারবে এসআইআর ঘিরে কমিশনের অন্দরের মতপার্থক্য নিয়ে ওঠা প্রশ্ন?

বিতর্কের মধ্যেই শনিবারের বৈঠকে কমিশনের অভ্যন্তরীণ কাজের পদ্ধতি নিয়েও একাধিক সিদ্ধান্ত হয়েছে। বৈঠকের আগে আলোচ্যসূচি সদস্যদের কাছে পাঠানো, বৈঠকের কার্যবিবরণী তৈরি এবং কমিশনারদের নির্দেশ যথাযথভাবে কার্যকর করার মতো ব্যবস্থার কথা জানানো হয়েছে। পাশাপাশি ECINET এর কার্যকারিতা খতিয়ে দেখতে বিশেষজ্ঞ-সহ একটি কমিটি গঠনের সিদ্ধান্তও হয়েছে। এমনকি এইআরও বা ইআরও অফিসে শুনানির জন্য সশরীরে না গিয়ে  অনলাইনেই শুনানি করা যাবে। পাশাপাশি দিল্লিতে এসআইআরের সময়সীমা বৃদ্ধি করা হয়েছে বলেও জানানো হয়েছে। অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গে যাদের নাম বাদ গিয়েছে তাঁদের জন্যেও বিশেষ কর্মসূচিও ঘোষণা করার কথা হয়েছে। শুধু তাই নয়, এসআইআরের নোটিশ পেলেও এখনই শুনানিতে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। 

আরও পড়ুন: আপনারা বাংলা নিয়েছেন, আমরা দিল্লি নেব: চ্যালেঞ্জ মমতার, সভা থেকে ‘ভ্যানিশ কুমার’কে তীব্র খোঁচা

গত ১০ মাসে এসআইআর এবং ভোটার তালিকা সংক্রান্ত একাধিক সিদ্ধান্ত নিয়ে সান্ধু ও যোশী লিখিত আপত্তি জানিয়েছেন বলে দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। সেই প্রতিবেদন প্রকাশের পরই ঝড় উঠে দেশ জুড়ে। নতুন ভোটার অন্তর্ভুক্তি, ভোটারদের নাম বাদ দেওয়া, নির্বাচনী তথ্যভান্ডারে প্রবেশাধিকার এবং আইটি ব্যবস্থাপনা এমন একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তাঁদের আপত্তির কেন্দ্রে ছিল। 

সবচেয়ে বেশি বিতর্ক তৈরি হয়েছে নতুন ভোটারদের নাম নথিভুক্তির ফর্ম ৬-এ পরিবর্তন নিয়ে। এসআইআর-এর আগের ভোটার তালিকার সঙ্গে আবেদনকারীর নিজের, বাবা-মা বা ঠাকুরদা-ঠাকুমার নামের যোগসূত্র জানতে ওই ফর্মে নতুন ঘোষণা যুক্ত করা হয়েছিল। প্রকাশিত নথি অনুযায়ী, এই পরিবর্তন কার্যকর করার আগে নিয়ম সংশোধনের প্রয়োজন রয়েছে বলে যোশী আপত্তি তুলেছিলেন এবং সান্ধুও পরে এই পদক্ষেপকে ‘অননুমোদিত’ ও ‘অবৈধ’ বলে উল্লেখ করেন।

আরও পড়ুন: 'ভোট চোর’! জ্ঞানেশকে নিয়ে প্যারোডি বামেদের

এর পাশাপাশি ভোটার তালিকার ডিজিটাল তথ্যভান্ডার কতটা কেন্দ্রীভূত হচ্ছে, তা নিয়েও দুই কমিশনার প্রশ্ন তুলেছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁদের আশঙ্কা ছিল, মাঠপর্যায়ে আইনত দায়িত্বপ্রাপ্ত আধিকারিকদের তথ্যভান্ডারে পূর্ণ প্রবেশাধিকার সীমিত হলে ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রক্রিয়ায় সমস্যা তৈরি হতে পারে। গোয়ায় ৯৭ জন ভোটারের নাম সংক্রান্ত একটি ঘটনাকেও এই বিতর্কের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। কমিশনের নথি অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট আধিকারিকরা তাঁদের যোগ্য বলে বিবেচনা করলেও সফটওয়্যারগত সমস্যার কারণে তাঁদের নাম চূড়ান্ত তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা যায়নি।

এই অভিযোগ ও প্রশ্নের মধ্যেই অবশ্য নির্বাচন কমিশনের পাল্টা অবস্থানও স্পষ্ট। শনিবারের পূর্ণাঙ্গ বৈঠকের পর কমিশন জানিয়েছে, আজকের বৈঠকে এসআইআর নিয়ে ওঠা বিতর্কের মধ্যে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছে নির্বাচন কমিশন। কমিশনের দাবি, ২০২৫ সালের ২৪ জুন এসআইআর শুরুর সিদ্ধান্ত এবং পরবর্তী কর্মসূচি তিন কমিশনারের সর্বসম্মত অনুমোদনেই হয়েছে। একই সঙ্গে এসআইআর-সংক্রান্ত নোটিশ পাওয়া ভোটারদের ক্ষেত্রে প্রক্রিয়া আরও সহজ করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। প্রয়োজনে বুথ লেভেল অফিসাররা সংশ্লিষ্ট ভোটারদের বাড়িতে গিয়ে প্রয়োজনীয় নথি সংগ্রহ করে ECINET-এ আপলোড করবেন এবং নির্দিষ্ট আধিকারিক তা যাচাই করে সিদ্ধান্ত নেবেন। Form 6-এর সঙ্গে যুক্ত ঘোষণাপত্র নিয়েও কমিশন তাদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে। পাশাপাশি ECINET-এর কার্যকারিতা খতিয়ে দেখতে বিশেষজ্ঞ-সহ একটি কমিটি গঠন এবং ভবিষ্যতে নতুন কোনও আইটি ব্যবস্থা চালুর আগে তা সংশ্লিষ্ট কমিটির মাধ্যমে পর্যালোচনার সিদ্ধান্ত হয়েছে। দিল্লি ও মহারাষ্ট্রে এসআইআর-এর দাবি ও আপত্তি জানানোর সময়সীমাও বাড়ানো হয়েছে। বৈঠকের মাধ্যমে একদিকে প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় কিছু পরিবর্তনের ঘোষণা, অন্যদিকে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলি সর্বসম্মত ছিল—এই বার্তাই সামনে এনেছে কমিশন। ফলে একদিকে দুই কমিশনারের নথিভুক্ত আপত্তি ঘিরে প্রশ্ন, অন্যদিকে কমিশনের ‘সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত’ এর দাবি এই দুইয়ের টানাপোড়েনেই এখন আরও বড় হয়ে উঠেছে এসআইআরকে ঘিরে স্বচ্ছতা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ার প্রশ্ন।