বাড়ির সামনে গভীর রাত পর্যন্ত চলছিল ধাবার হইচই। মদ্যপ যুবকদের চিৎকার-চেঁচামেচিতে অতিষ্ঠ হয়ে প্রতিবাদ করেছিলেন মণিপুরের পরিচিত সঙ্গীতশিল্পী চংথাং বিক্রম সিং। অভিযোগ, সেই প্রতিবাদই কাল হয়ে দাঁড়ায়। কয়েকজন যুবকের হাতে আক্রান্ত হয়ে গুরুতর জখম হন ৫৪ বছরের শিল্পী। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সোমবার মৃত্যু হয় তাঁর। ঘটনার জেরে এখনও পর্যন্ত আট জনকে গ্রেফতার করেছে দিল্লি পুলিশ। ধৃতদের মধ্যে একজন নাবালক রয়েছে বলে জানা গিয়েছে। দক্ষিণ-পূর্ব দিল্লির কিলোকরি গ্রামে দীর্ঘদিন ধরে ওই এলাকাতেই স্ত্রী ও সন্তানকে নিয়ে থাকতেন বিক্রম। বাড়ির সামনেই ছিল একটি ধাবা। পরিবারের অভিযোগ, রাত বাড়লেই সেখানে জড়ো হতেন কয়েকজন যুবক। মদ্যপ অবস্থায় তাঁদের চিৎকার-চেঁচামেচিতে প্রায়ই এলাকার পরিবেশ অশান্ত হয়ে উঠত।

রবিবার রাতেও একই পরিস্থিতি তৈরি হয়। হট্টগোল শুনে বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসেন বিক্রম। প্রথমে যুবকদের রাতের বেলায় নিচু স্বরে কথা বলার অনুরোধ করেন তিনি। অভিযোগ, সেই নিয়েই শুরু হয় বচসা। আচমকাই এক যুবক তাঁকে আঘাত করেন। এরপর আরও কয়েকজন তাঁর উপর হামলা চালান বলে অভিযোগ। রাস্তায় পড়ে যাওয়ার পরও তাঁকে মারধর করা হয় বলে পরিবারের দাবি। বিক্রমের পরিবারের সদস্যরা সঙ্গে সঙ্গে পুলিশকে খবর দেন। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছে তাঁকে উদ্ধার করে পুলিশ। পরে তাঁকে হোলি ফ্যামিলি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু চিকিৎসকদের সমস্ত চেষ্টা ব্যর্থ করে সোমবার মৃত্যু হয় তাঁর। এরপর পরিবারের অভিযোগের ভিত্তিতে সানলাইট কলোনি থানায় ভারতীয় ন্যায় সংহিতার ১০৩(২)/৩(৫) ধারায় মামলা দায়ের করা হয়। তদন্তে নেমে পুলিশ আটজনকে আটক করে গ্রেফতার করেছে। তাঁদের মধ্যে একজন নাবালক। ধৃতদের পরিচয় এখনও প্রকাশ্যে আনেনি পুলিশ। দক্ষিণ-পূর্ব দিল্লির ডেপুটি কমিশনার বিনীত কুমার জানিয়েছেন, মৃতের পরিবারের সঙ্গে কথা হয়েছে। ঘটনার তদন্ত চলছে এবং আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করা হবে। মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিশ্চিত করতে দিল্লি এইমসে ময়নাতদন্তের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

প্রসঙ্গত, চংথাং বিক্রম সিং ওয়েস্টার্ন মিউজিকের জগতে বেশ পরিচিতি অর্জন করেছিলেন। গিটারিস্ট হিসেবে একাধিক ব্যান্ডের সঙ্গে কাজ করেছেন তিনি। Ultra Vires, Phoenix এবং Eastern Dark-এর মতো ব্যান্ডের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বিক্রম। বিক্রমের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই দিল্লির মণিপুরি সম্প্রদায়ের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দেয়। সানলাইট কলোনি থানার সামনে বিক্ষোভে সামিল হন বিভিন্ন মণিপুরি সংগঠন ও উত্তর-পূর্ব ভারতের প্রতিনিধিরা। তাঁদের দাবি, দ্রুত এবং নিরপেক্ষ তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের নর্থ ইস্ট স্টুডেন্টস সোসাইটিও বিক্রমের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছে। পরিবারের সদস্যদের দাবি, এলাকায় বেশ কিছুদিন ধরেই রাতের হট্টগোল নিয়ে সমস্যা চলছিল। তাঁদের অভিযোগ, সেই সমস্যার প্রতিবাদ করতেই হামলার শিকার হন বিক্রম। স্বাভাবিকভাবেই এই ঘটনায় দিল্লিতে বসবাসকারী উত্তর-পূর্ব ভারতের বাসিন্দাদের নিরাপত্তা নিয়েও ফের উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। যদিও বিক্রমের উপর হামলার সঙ্গে জাতিগত বিদ্বেষের কোনও যোগ ছিল কি না, সে বিষয়ে এখনও নিশ্চিত কোনও তথ্য মেলেনি। তদন্তের পরই সেই প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাবে।