বিশ্বাস করা কঠিন হলেও বাস্তবের মাটিতে দাঁড়িয়ে কর্তব্য ও শিক্ষকধর্মের এক অনন্য নজির গড়ে চলেছেন তিনি। স্কুলে পড়ুয়া বলতে এখন কেবল একজনই। তবু সেই একটি মাত্র শিশুর পড়াশোনা যাতে থমকে না যায়, তার জন্য রোজ সকালে ঘন জঙ্গলের বুক চিরে ৫ কিলোমিটার পথ একাই হেঁটে স্কুলে পৌঁছন মহারাষ্ট্রের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক জীবন মিঠারি।

যানবাহনহীন সেই দুর্গম পথে যে কোনো মুহূর্তে চিতাবাঘ ঝাঁপিয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে। আশপাশের গ্রামের মানুষ যখন বন্যপ্রাণের আতঙ্কে কাঁটা হয়ে থাকেন, তখন কোনো ভয়কেই তোয়াক্কা করেন না ৫৫ বছর বয়সি এই শিক্ষক।
মহারাষ্ট্রের কোলহাপুর জেলার গগনবাওয়াড়া তালুকে সিন্ধুদুর্গ সীমানার কাছে অবস্থিত প্রত্যন্ত কাওয়ালটেক ধাঙ্গরওয়াড়া গ্রাম। সেখানেই রয়েছে জেলা পরিষদের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি। বর্তমানে এই স্কুলের একমাত্র নথিভুক্ত ছাত্রী তৃতীয় শ্রেণির স্বরা বোড়া। কিছুদিন আগেও স্কুলে হাতেগোনা কিছু পড়ুয়া আসত। কিন্তু প্রতিকূল ভৌগোলিক অবস্থান ও বাসিন্দাদের অন্যত্র সরে যাওয়ার কারণে একে একে কমেছে ছাত্রছাত্রী। কমতে কমতে সংখ্যাটা এখন এসে ঠেকেছে একজনে।
দিদির সঙ্গে ক্লাসে এসে বসে থাকে স্বরার বছর তিনেকের ছোট্ট বোনও। বয়স কম হওয়ায় এখনও আনুষ্ঠানিক ভাবে তার ভর্তি হওয়া সম্ভব হয়নি। আগামী শিক্ষাবর্ষে স্বরা চতুর্থ শ্রেণিতে উঠলে প্রথম শ্রেণিতে পা রাখবে বোন। প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে শিক্ষক আসবেন, সেই আশায় ক্লাসরুমে বসে থাকে ওই দুই খুদে।
এই প্রত্যন্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জীবনের উপস্থিতি কোনো প্রশাসনিক নির্দেশের ফল নয়, তাঁর নিজস্ব সিদ্ধান্তের ফসল। অতীতে তিনি কোলহাপুর জেলা প্রাথমিক শিক্ষক কো-অপারেটিভ ব্যাঙ্কের চেয়ারম্যান ছিলেন এবং শহরের কাছেই একটি স্কুলে শিক্ষকতা করতেন। কিন্তু সহকর্মীদের কটাক্ষ ও বাধা অগ্রাহ্য করে স্বেচ্ছায় এই দুর্গম পাহাড়ি গ্রামের স্কুলে বদলি নিয়ে চলে আসেন তিনি।
যাতায়াতের পথে পদে পদে বিপদ থাকলেও কখনও নিরাপদ জায়গায় ফেরার জন্য আবেদন করেননি। তবে বয়স বাড়ছে। আগামী ২০২৯ সালে তাঁর অবসর নেওয়ার কথা। জীবনের পর জঙ্গলের এই বিপজ্জনক পথ পেরিয়ে আর কেউ কি এই এক চিলতে স্কুলে পাঠ দিতে আসবেন? স্বরা আর তার বোনের ভবিষ্যৎ শিক্ষাজীবন নিয়ে সেই গভীর আশঙ্কাই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে জঙ্গলঘেরা ওই ছোট্ট জনপদে।
















