সরকারি হাসপাতালেই চিকিৎসক-নার্সদের বিরুদ্ধে গাফিলতির অভিযোগ তুলে আতঙ্কে চিৎকার করেছিলেন এক প্রসূতি ‘আমাকে মেরে ফেলবে, বাঁচাও’। সেই আর্তির কিছুক্ষণের মধ্যেই সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের পর মৃত্যু হল তাঁর এবং সদ্যোজাত সন্তানের। বিজেপি শাসিত মধ্যপ্রদেশে (Madhya Pradesh) সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থার এই ঘটনা ফের তুলে দিল ভয়াবহ প্রশ্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসে যদি এক প্রসূতিকে নিজের প্রাণ নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করতে হয়, আর তার পরই মা ও শিশুর মৃত্যু ঘটে, তবে সেই স্বাস্থ্যব্যবস্থার দায় এড়াবে কীভাবে বিজেপি সরকার? পরিবারের অভিযোগের তির চিকিৎসক ও নার্সদের দিকেই। অথচ বিজেপি সরকারের অধীনে সরকারি হাসপাতালের নজরদারি এবং জবাবদিহি কোথায় ছিল, রেওয়ার এই মর্মান্তিক ঘটনা সেই প্রশ্নকেই আরও তীব্র করে তুলল।
ঘটনাটি রেওয়া জেলার সঞ্জয় গান্ধী মেমোরিয়াল হাসপাতালের (Sanjay Gandhi Memorial Hospital, Rewa District)। গত ২৬ অগাস্ট রাতে কুপাট এলাকার বাসিন্দা কল্পনা মিশ্রকে (Kalpana Mishra) সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের জন্য অপারেশন থিয়েটারে নেওয়া হয়। তার আগে অসুস্থ কল্পনার একটি ভিডিও (ভিডিওর সত্যতা যাচাই করেনি বিশ্ববাংলা সংবাদ) সামনে। সেই ভিডিওতে তিনি তীব্র যন্ত্রণার কথা জানিয়ে পরিবারের সদস্যদের তাঁকে বাঁচানোর আবেদন করেন। পরিবারের অভিযোগ, হাসপাতালের চিকিৎসক ও কর্মীদের কাছে তাঁদের উদ্বেগের কথা জানানো হলেও প্রয়োজনীয় গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। অস্ত্রোপচারের পর কল্পনার জ্ঞান না ফেরা এবং পরে মা ও সন্তানের মৃত্যুর ঘটনায় অ্যানাস্থেসিয়া প্রয়োগ নিয়েও গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন পরিজনেরা। মৃতার বাবা রামশরণ মিশ্র দোষীদের বিরুদ্ধে এফআইআর এবং কঠোর শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
মা ও সদ্যোজাতের মৃত্যুর খবর প্রকাশ্যে আসতেই সরকারি হাসপাতালের বিরুদ্ধে ক্ষোভে ফেটে পড়েন পরিবারের সদস্য ও স্থানীয় বাসিন্দারা। হাসপাতালের প্রবেশপথে কয়েক ঘণ্টা ধরে চলা বিক্ষোভে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে পরিস্থিতি। শেষ পর্যন্ত প্রশাসনের আশ্বাসের পর ময়নাতদন্তে সম্মতি দেয় পরিবার। ঘটনার জেরে ডিউটিতে থাকা দুই নার্সিং অফিসারকে বরখাস্ত করা হয়েছে এবং মৃত্যুর কারণ ও চিকিৎসা প্রক্রিয়া খতিয়ে দেখতে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। তদন্তের কথা ঘোষণা হলেও প্রশ্ন উঠছে, চিকিৎসা নিয়ে পরিবারের এত অভিযোগ এবং প্রসূতির আতঙ্কের কথা সামনে আসার পরও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের নজরদারি কেন কার্যকর হল না। যদিও হাসপাতাল প্রশাসনের পক্ষ থেকে চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে ওঠা গাফিলতির অভিযোগ মানা হয়নি।
এই ঘটনা বিজেপি শাসিত মধ্যপ্রদেশের সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থার দীর্ঘদিনের সঙ্কটকেও নতুন করে সামনে এনে দিয়েছে। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, রাজ্যে অনুমোদিত ৫,৪৪৩টি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক পদের মধ্যে ৩,৯৪৮টিই খালি। সাধারণ মেডিকেল অফিসারের ৬,৫১৩টি পদের মধ্যে শূন্য রয়েছে ২,৬৮৯টি। এত বিপুল সংখ্যক পদ ফাঁকা রেখে স্বাস্থ্য পরিষেবার মান কীভাবে বজায় রাখা হচ্ছে, সেই প্রশ্ন উঠছে স্বাভাবিকভাবেই। চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীর ঘাটতি, সরকারি হাসপাতালের পরিকাঠামোগত সমস্যা এবং নজরদারির অভিযোগের মধ্যেই রেওয়ার এই মা-শিশু মৃত্যুর ঘটনা বিজেপি সরকারের স্বাস্থ্যনীতি নিয়ে নতুন করে বড় প্রশ্ন তুলে দিল। এক প্রসূতি মৃত্যুর আগে প্রাণ বাঁচানোর আবেদন জানালেন, আর শেষ পর্যন্ত মা ও নবজাতক দু’জনকেই হারাতে হল পরিবারকে। এই ঘটনার দায় থেকে বিজেপি সরকার কতটা মুখ ফিরিয়ে থাকতে পারে, এখন সেই প্রশ্নই জোরালো হচ্ছে।
















