কেন বারবার ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মুখে পড়তে হচ্ছে ভারতের প্রতিবেশী রাষ্ট্র নেপালকে? নেপথ্যে কি কেবলই প্রতিকূল ভৌগোলিক অবস্থান, নাকি মানুষের তৈরি অপরিকল্পিত উন্নয়নযজ্ঞও সমান ভাবে দায়ী? সাম্প্রতিক দুর্যোগের পর নতুন করে এই প্রশ্নগুলি জোরালো হয়ে উঠেছে পরিবেশবিদ ও ভূতত্ত্ববিদদের মহলে।
বিজ্ঞানীদের মতে, নেপালের ঘনঘন দুর্যোগের প্রধান কারণ তার ভূপ্রাকৃতিক অবস্থান। দেশটি ভারতীয় এবং ইউরেশীয় পাতের সংযোগস্থলে অবস্থিত। এই দুটি পাতের মধ্যে ক্রমাগত সংঘাত চলার কারণে ভারতীয় পাতটি প্রতি বছর গড়ে প্রায় ৫ সেন্টিমিটার করে ইউরেশীয় পাতের নীচে প্রবেশ করছে। নবীন ভঙ্গিল পর্বতমালা হওয়ার কারণে হিমালয়ের ভূতাত্ত্বিক গঠনের কাজ আজও সম্পূর্ণ হয়নি। ফলে ভূ-উত্থানের প্রক্রিয়া এখনও জারি রয়েছে এবং প্রতি বছর মাউন্ট এভারেস্টের উচ্চতা প্রায় ৫ মিলিমিটার করে বাড়ছে। ভূগর্ভে ক্রমাগত সঞ্চিত হওয়া এই প্রবল টেকটনিক চাপ শিলাস্তরের ফাটল দিয়ে আচমকা নির্গত হলেই ঘটে বিধ্বংসী ভূমিকম্প।
ভূমিকম্পের পাশাপাশি নেপাল তথা সমগ্র হিমালয় অঞ্চলে বিপদের অন্যতম বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে দ্রুত হারে হিমবাহের গলন। উপগ্রহ চিত্রের মাধ্যমে ভারত, চিন, নেপাল, ভুটান ও তিব্বত জুড়ে হওয়া দীর্ঘমেয়াদি গবেষণায় দেখা গিয়েছে, ১৯৭৫ থেকে ২০০০ সালের তুলনায় ২০০০ সালের পর থেকে হিমবাহ গলার গতি দ্বিগুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। বিগত চার দশকে হিমালয়ের হিমবাহগুলির মোট বরফের প্রায় এক-চতুর্থাংশ গলে জল হয়ে গিয়েছে। প্রতি বছর গড়ে দেড় ফুটেরও বেশি বরফ গলতে থাকায় হিমবাহ হ্রদগুলির ওপর চাপ বাড়ছে এবং প্রায়শই ঘটছে হড়পা বান বা গ্লেসিয়াল লেক আউটবার্স্ট ফ্লাড।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পাহাড়ি অঞ্চলে অবৈজ্ঞানিক ও অপরিকল্পিত নির্মাণকাজ। পরিবেশবিদদের স্পষ্ট অভিযোগ, উন্নয়নের নামে দেদার অরণ্য নিধন, সুড়ঙ্গ খনন এবং নদী অববাহিকায় অনিয়ন্ত্রিত পরিকাঠামো তৈরি এই বিপর্যয়কে আরও ত্বরান্বিত করছে। ইতিপূর্বে চামোলির ধৌলিগঙ্গা, কিস্তওয়াড়, সিকিমের সাউথ লোনাক হ্রদ বিপর্যয়ের মতো ঘটনাগুলির পর নেপালের সাম্প্রতিক পরিস্থিতিও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে, প্রকৃতির সতর্কবার্তাকে উপেক্ষা করার মাশুল কতটা চড়া হতে পারে।
















