বাচ্চার প্রোটিন সম্মত টিফিন হোক বা স্বামীর লাঞ্চবক্স সব দায়িত্ব গৃহিণীর হাতেই। তাই ওয়ার্কিং হন বা প্রফেশনাল বা স্মার্ট হোম মেকার তাঁদের চাই ইনস্ট্যান্ট এনার্জি। কিন্তু সারাদিনের একটানা দৌড়ঝাঁপে সেই এনার্জিরই তো দফারফা। নিজেকে চনমনে এবং পুষ্টিগুণে ভরপুর রাখতে এখন বাজারে রয়েছে নানারকম এনার্জি বা নিউট্রিশনাল বার। বাজারচলতি হোক বা হোমমেড ব্যাগে রাখো দরকার মতো খেয়ে নাও। লিখলেন শর্মিষ্ঠা ঘোষ চক্রবর্তী।

জীবনের জেটগতি, ঘরে বাইরে একমুহূর্ত নেই ফুরসত। সকালে ঘুম ভাঙা থেকে মধ্যরাতে বিছানায় শরীর এলিয়ে দেওয়া অবধি এই পুরো সাইকেলটা খালি ছুট আর ছুট! বিশেষ করে বাড়ির মহিলাদের। তাঁরা ওয়ার্কিং হন বা প্রফেশনাল বা স্মার্ট হোম মেকার দায়িত্ব পালন করতে করতে নাভিশ্বাস উঠে যায়। বাচ্চার প্রোটিন সম্মত টিফিন, স্বামীর শরীর বুঝে ডায়েট মেন্টেন করা লাঞ্চবক্স— সব দায়িত্ব তাঁদের হাতেই। বাড়িতে আরও দু-একজন সদস্য বেশি থাকলে তো কথাই নেই। এই ইঁদুর দৌড়ে এনার্জির দফরফা। কিন্তু গৃহকত্রী নিজেই যদি সুস্থ এবং এনার্জিটিক না থাকেন তাহলে অন্যদের ভাল রাখবেন কীভাবে। তাই শর্টকার্টে হরেক পুষ্টির একসঙ্গে জোগান দেওয়ার এখন বেস্ট অপশন হল এনার্জি বার।

শুধু মহিলারা নন, বাড়ন্ত এবং দুরন্ত বাচ্চা, যাঁরা খুব ট্রাভেল করেন বা সারাদিন বাইরে বাইরে থাকতে হয় তাঁদের জন্যেও ব্যাগে পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ বিভিন্ন ধরণের প্রোটিন বা এনার্জি বার সহজ এবং স্বাস্থ্যকর সমাধান। খিদে পেলেই বাইরে থেকে খাবার অর্ডার না করে ব্যাগ থেকে বের করে কামড় বসিয়ে দিন ব্যস কেল্লাফতে। কিন্তু প্রশ্ন হল, আধুনিক ব্যস্ততম যুগে এই ধরনের প্রোটিন বা এনার্জি বার কতটা স্বাস্থ্যকর? এমন নয় তো যে প্রোটিন বারের সঙ্গেই আপনার শরীরে ঢুকে পড়ছে অতিরিক্ত ফ্যাট বা চিনি? তাই নিউট্রিশন বারে নির্ভর হতে সবার আগে সেটি সম্পর্কে একটা সম্যক ধারণা থাকা জরুরি।

কী এই এনার্জি বার?

এনার্জি বার আসলে পুষ্টিতে ভরপুর সুস্বাদু স্ন্যাক বার। যা বিভিন্ন স্বাস্থ্যকর উপাদান দিয়ে তৈরি হয় যেমন ওটস, গ্র্যানোলা, কিনোয়া, আমন্ড, কিশমিশ, খেজুর, ফ্ল্যাকসিড, গুড়, তিল, তিসি, শুকনো ফল বা ড্রাই ফ্রুটস, বাদাম, মধু এবং নানা ধরনের ফল ইত্যাদি। এই এনার্জি বার এতদিন পর্যন্ত স্পোর্টস বার বা প্রোটিন বার হিসেবেই পরিচিত ছিল। মূলত ক্রীড়াবিদ, প্রশিক্ষকদের জন্যেই রেকমেন্ডেড ছিল। কিন্তু এখন স্বাস্থ্য সচেতন সকলেই এই প্রোটিন বার খান। কিছু কিছু প্রোটিন বার ডায়াবেটিস রোগীর জন্যে উপযোগী আবার ছোটদের জন্যেও খুব স্বাস্থ্যকর এই প্রোটিন বার। এটা যে কোনও পুষ্টিকর খাবারের বিকল্প হতে পারে। প্রোটিন বার ওজন কমাতেও সহায়তা করে। ৫০-৮০ গ্রামের এক-একটি বার মোটামুটি ২০০-৩০০ ক্যালরি এনার্জি, ৩-৯ গ্রাম ফ্যাট, ৭-১৫ গ্রাম প্রোটিন এবং ২০-৪০ গ্রাম কার্বোহাইড্রেট থাকে।তবে যেটাই খাবেন সবসময় কেনার আগে বা বাড়িতে তৈরি করার সময় উপকরণ ও তার নিউট্রিশনাল ভ্যালু সম্পর্কে জেনে নিন। যাঁরা হাই ইন্টেন্সিটি ওয়র্ক আউট করছেন বা হাই-প্রোটিন ডায়েট ফলো করছেন তাঁদের জন্যে এনার্জি বার আদর্শ। তাঁদেরই এনার্জি বার খাওয়ার পরামর্শ দেন এক্সপার্টরা। এই বার নানা ধরনের হয় যেমন—প্রোটিন বার, যদি প্রোটিন বেশি ইনটেক করতে চান বা হাই প্রোটিন ডায়েট ফলো করেন তাহলে প্রোটিন বার আপনার জন্যে ঠিক অপশন। তবে বার কেনার আগে তার মধ্যে চিনি আছে কি না দেখে নেবেন কারণ চিনি ঠাসা বার আপনার কোন কাজে আসবে না।

প্রি-ওয়ার্ক আউট বার

প্রি-ওয়ার্ক আউট বার আপনার ওয়ার্ক আউটের জন্যে শক্তির জোগান দেয়। সাধারণত এক্সারসাইজ শুরুর আগে এটা খেতে হয়। এই ধরনের বার কমপ্লেক্স কার্বোহাইড্রেট দিয়ে তৈরি হয় কারণ এতে এনার্জি খুব ধীরগতিতে ক্ষয় হয় বিশেষ করে ব্যায়াম চলাকালীন। আবার ওজন কমানোর এনার্জি বার ও হয় যাতে ক্যালরি ও কার্ব কম থাকবে পরিবর্তে প্রোটিনের পরিমাণ বেশি থাকবে।মিল রিপ্লেসমেন্ট বার

যাঁরা নিয়মিত ডায়েট করেন এবং ওজন কমাতে চান তাঁদের জন্য আদর্শ হল মিল রিপ্লেসমেন্ট বার। এই ধরনের বার এমন উপাদানেই তৈরি হয় যা শরীরে সার্বিক পুষ্টিগুণ সরবরাহ করে। এই বারে ফ্যাট, কার্বোহাইড্রেট এবং প্রোটিনের ব্যালান্স করবে এমন উপাদানই থাকে। ব্রেকফাস্ট, লাঞ্চের বিকল্প হতেই পারে এই মিল রিপ্লেসমেন্ট বার।

ডেইলি অ্যাক্টিভিটি বার

যাঁরা সারাদিনের বেশিটাই বাইরে বাইরে কাটান তাঁদের জন্য এই ডেইলি অ্যাক্টিভিটি বার খুব কার্যকরী। এগুলো এনডিওরেন্স এবং মিল রিপ্লেসমেন্ট বারের সংমিশ্রণ। ব্যস্ত লাইফস্টাইলের মাঝে ঝটপট শরীরকে চাঙ্গা রাখতে এবং দীর্ঘস্থায়ী শক্তি (Sustained Energy) জোগাতে সাহায্য করে।

ছোটদের জন্যে 

বাচ্চাদের জন্যে এনার্জি বার স্বাস্থ্যকর বিকল্প। চকোলেট, পিনাট বাটার এবং বিভিন্ন ফলের স্বাদের বারগুলো বাচ্চাদের পছন্দেরও হয় আবার শরীরে এনার্জি, পুষ্টি সবকিছুর জোগান দেয়। কারণ বাচ্চারা চিনিযুক্ত জাঙ্ক ফুড বেশি পরিমাণে খায়, তার বিকল্প হিসেবে এই বার কাজ করে। একটু মুচমুচে বারই বাচ্চাদের বেশি পছন্দ। বাচ্চাদের এনার্জি বারে খেজুর ও মধু খুব গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।

খেজুর বার তৈরির দারুণ উপাদান: খেজুরকে বলা প্রাকৃতিক মিষ্টি বলা হয়। স্বাদে তো বটেই এতে রয়েছে ফাইবার, প্রোটিন, আয়রন, ক্যালসিয়াম এবং আরও বিভিন্ন ভিটামিন ও খনিজ পদার্থের মতো পুষ্টি উপাদান ভরপুর থাকে। খেজুরে রোগ-প্রতিরোধী অ্যান্টিঅক্সিডেন্টও প্রচুর পরিমাণে থাকে এবং এর রয়েছে বহুবিধ স্বাস্থ্য উপকারিতা। যেকোনও ভালো এনার্জি বার অতিরিক্ত চিনি এবং হাই ফ্রুক্টোজ কর্ন সিরাপের মতো কৃত্রিম মিষ্টি ব্যবহার না করে বরং বারটিকে মিষ্টি করতে অবশ্যই খেজুর শুকনো ফল, মধু ব্যবহার করুন। 

খেজুরের এনার্জি বার উপকরণ : ডায়াবেটিস রয়েছে যাঁদের তাঁদের জন্যে আদর্শ এই এনার্জি বার। ১০ থেকে ১২টা খেজুর, আধকাপ কাঁচা বাদাম, আধকাপ আখরোট, আধকাপ কুমড়োর বীজ, ২ টেবিল চামচ গুঁড়ো ফ্ল্যাকসিড, ২ টেবিল চামচ তিল,১ চা চামচ দারুচিনি, ১ চা চামচ ঘি (জমাট বাঁধার জন্যে), ১ চিমটে সামুদ্রিক লবণ।

পদ্ধতি : খেজুর বীজ ছাড়িয়ে জলে ফুটিয়ে ক্কাথ বের করে নিন বা ছোট ছোট করে কুচিয়ে নিন। তিল, কুমড়োর বীজ, আখরোট, কাচাবাদাম শুকনো খোলায় ভেজে নিন। গুঁড়ো করে নিন। এবার সব উপকরণ একসঙ্গে মিশিয়ে নিন, এক চামচ ঘি দেবেন নুন ও ফ্ল্যাকসিড গুঁড়ো দিয়ে মেখে নিন। এবার একটা বড় ট্রে-তে ঢেলে দিন। চেপে চেপে ছড়িয়ে বসিয়ে দিন। শুকিয়ে এলে ফ্লিজে রাখুন আধঘণ্টা বের করে কেটে টুকরো করে নিন। এয়ারটাইট বক্স রেখে দিন।

ক্র্যানবেরি আখরোট গ্রানোলা বার 

উপকরণ : আধকাপ শুকনো ক্র্যানবেরি, আধকাপ গ্রানোলা, দু’কাপ ওটস গুঁড়ো করা, আধকাপ আখরোট বা কাজুবাদাম কুচি, ১ টেবিল চামচ পিনাট বাটার, নারকেল তেল বা মাখন ১ টেবিল চামচ,ভ্যানিলার রস ১ চা-চামচ এবং নুন সামান্য।  

পদ্ধতি : ওটস, গ্রানোলা, শুকনো ক্র্যানবেরি, কাজু বা আখরোট কুচি শুকনো কড়ইয়ে একসঙ্গে নেড়ে নিন যাতে মুচমুচে হয়। মিক্সিতে একটু দানা রেখে গুঁড়ো করে নিন। এবার একটা পাত্রে নিয়ে মধু, তেল বা মাখন যে কোনও একটা দিন,ভ্যানিলার রস দিন সব ভাল করে মিশিয়ে মেখে নিন। ওটা ট্রে-তে ভাল করে ছড়িয়ে চেপে চেপে বসিয়ে দিন। শুকিয়ে আঁঠালো হয়ে গেলে ফ্রিজে রাখুন একঘণ্টা। এরপর বের করে কেটে নিন। এয়ারটাইট বক্স রেখে দিন। ফ্রিজে রাখলে দু’সপ্তাহের বেশি সংরক্ষণ করতে পারবেন। সেক্ষেত্রে একটি জিপ-লক ব্যাগে রাখুন অথবা ক্লিং ফিল্ম বা পাতলা স্বচ্ছ প্লাস্টিকের মোড়ক (যা কোনও আঠা ছাড়াই খাবার বা পাত্রের গায়ে শক্তভাবে আটকে থেকে বাতাস ও আর্দ্রতা রোধ করে) মুড়ে রেফ্রিজারেটরে রাখুন।