বিকেলের দিকে হুট করেই মনটা চকোলেট বা মিষ্টির জন্য ছটফট করে উঠল। কিন্তু সেই মিষ্টি মুখে দিতে না দিতেই পরের মুহূর্তে তীব্র ইচ্ছে হল চিপস বা ঝাল-নোনতা কিছু চিবানোর। এই যে জিভের স্বাদের অনবরত ভোলবদল—কখনও মিষ্টির প্রতি তীব্র টান, আবার পরমুহূর্তেই নোনতা খাবারের জন্য আকুলতা—একে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ফুড ক্রেভিং (Food Craving)। আপনার সাথেও কি এমনটা প্রতিদিন ঘটছে? যদি উত্তর ‘হ্যাঁ’ হয়, তবে এটিকে অবহেলা করবেন না। এটি কেবল আপনার জিভের বিলাসবহুল কোন চাহিদা নয়, বরং আপনার শরীর ভেতরের কোন বিশেষ পরিস্থিতির জানান দিতে চাইছে।

আরও পড়ুন: ‘জেলা রাহুমুক্ত হল’, সভাপতি বদল হতেই বিজেপিতে কোন্দল

হুটহাট চকোলেট-মিষ্টি বা নোনতার এই গোলকধাঁধায় শরীর আসলে কীসের সংকেত দিচ্ছে, আসুন জেনে নিই। 

চকোলেটের ক্রেভিং: শরীরে কি ম্যাগনেসিয়ামের ঘাটতি?

গবেষকদের মতে, বারবার চকোলেট খাওয়ার তীব্র ইচ্ছা হওয়া শরীরে ম্যাগনেসিয়ামের ঘাটতির অন্যতম বড় লক্ষণ হতে পারে। কোকোয়াতে প্রাকৃতিকভাবে প্রচুর পরিমাণে ম্যাগনেসিয়াম থাকে, যা আমাদের মাংসপেশি শিথিল করতে এবং স্নায়ুর কার্যকারিতা সচল রাখতে সাহায্য করে। বিশেষ করে নারীদের পিরিয়ডের আগে বা সেই দিনগুলোতে হরমোনের পরিবর্তনের কারণে চকোলেটের প্রতি এই টান ব্যাপক বৃদ্ধি পায়। এছাড়া শরীরে আয়রন বা রক্তের অভাব থাকলেও অনেকে চকোলেটের খোঁজে ব্যাকুল হয়ে ওঠেন।

নোনতা খাবারের টান: জল কম খাচ্ছেন না তো?

মিষ্টি খাওয়ার ঠিক পরেই যখন চিপস, চানাচুর বা ফ্রেঞ্চ ফ্রাইজের মতো নোনতা খাবারের প্রতি মন উচাটন হয়, তার প্রধান কারণ হতে পারে ডিহাইড্রেশন বা শরীরের জলের ঘাটতি। শরীর যখন জলশূন্যতায় ভোগে, তখন ইলেক্ট্রোলাইটের যেমন সোডিয়াম ও পটাসিয়ামের ভারসাম্য নষ্ট হয়। শরীর তখন রক্তের লবণের মাত্রা ঠিক রাখতে দ্রুত নোনতা খাবারের সংকেত পাঠায়। মাত্রাতিরিক্ত ঘাম হওয়া বা রোদে বেশি থাকার কারণেও এমনটা হতে পারে।

আরও পড়ুন: “কিছু মানুষকে ধরে রাখতে পারিনি...” কীসের ইঙ্গিত দেবের

রক্তে শর্করার ওঠানামা ও ডায়াবেটিসের পূর্বাভাস

সারাক্ষণ মিষ্টি খাবার খোঁজার প্রবণতা কিন্তু রক্তে শর্করার মাত্রার (Blood Glucose) ওঠানামা বা ‘রোলারকোস্টার ইফেক্ট’-এর ইঙ্গিত হতে পারে। পরিশোধিত চিনিযুক্ত খাবার খাওয়ার পর রক্তে হঠাৎ করে ইনসুলিনের জোয়ার আসে। এর ফলে রক্তের গ্লুকোজ লেভেল দ্রুত নেমে যায় এবং মস্তিষ্ক আবার নতুন করে শর্করার চাহিদা তৈরি করে। চিকিৎসকদের মতে, এই চক্রটি প্রি-ডায়াবেটিস বা ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্সের প্রাথমিক লক্ষণ হতে পারে।

মানসিক চাপ এবং ঘুমের অভাব

আপনি কি ইদানীং খুব বেশি মানসিক চাপের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন? কিংবা রাতে ঘুম ঠিকমতো হচ্ছে না? স্ট্রেস বা ক্লান্তির সময় শরীরে কর্টিসল (Cortisol) নামের হরমোনের ক্ষরণ বেড়ে যায়। এই হরমোন মস্তিষ্ককে এমনভাবে উদ্দীপিত করে, যা দ্রুত শক্তির জন্য বেশি ক্যালোরি, ফ্যাট, চিনি এবং নোনতা খাবারের আসক্তি তৈরি করে। মিষ্টি বেশি খেলে মস্তিষ্কে ‘ডোপামিন’ অর্থাৎ সুখের হরমোন নিঃসৃত হয়, যা সাময়িক স্বস্তি দিলেও ক্রেভিং-এর এই দুষ্টচক্রকে আরও বাড়িয়ে দেয়।

আরও পড়ুন: ৫৭২ বছরেও অমলিন ঐতিহ্য, আজও মাছ-ভাতে মায়ের ভোগ ঘোষাল বাড়িতে

তাহলে এর থেকে মুক্তির উপায় কী?

প্রতিদিনের এই ‘খাই খাই’ ভাব দূর করতে জীবনযাত্রায় সামান্য কিছু পরিবর্তন আনা জরুরি। যেমন পর্যাপ্ত জল পান করুন, খাবারে প্রোটিন ও ফাইবার বাড়ান, ম্যাগনেসিয়াম সমৃদ্ধ খাবার খান, প্রতিদিন অন্তত ৭-৮ ঘণ্টা গভীর ঘুম নিশ্চিত করুন, যা হরমোনের ভারসাম্য বজায় রাখবে।

সতর্কবার্তা 

যদি লাইফস্টাইল পরিবর্তনের পরেও এই ক্রেভিং প্রতিদিন নিয়ম করে হতে থাকে এবং সেই সাথে অতিরিক্ত ক্লান্তি বা ওজন পরিবর্তনের মতো লক্ষণ দেখা যায়, তবে দেরি না করে একজন চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে রক্তের শর্করা (Blood Sugar) ও প্রয়োজনীয় ভিটামিন বা মিনারেল টেস্ট করিয়ে নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ হবে।