ভারত মানেই যে বৈচিত্র্যময় এক দেশ, এ কথা যেন পরতে পরতে লেখা রয়েছে। যখন গোটা দেশ চাতক পাখির মতো বর্ষার শেষে শরতের মেঘ খোঁজে, ঠিক তখনই হিমালয়ের এক কোণে রং ছাড়া শুধু মাখন আর ঘোল দিয়ে খেলে নেওয়া হয় এক অদ্ভুত হোলি। বসন্তের চড়া রোদে আবির আর রঙের চেনা উৎসব তো সারা দেশই দেখে। কিন্তু ভরা বর্ষায়, মেঘ-কুয়াশার চাদরে ঢাকা হিমালয়ের কোলে এমন মাখামাখির দৃশ্য বোধহয় এ দেশ ছাড়া আর কোথাও দেখা সম্ভব নয়।

আরও পড়ুন: Asian Games: শুটিংয়ে তৃতীয় রুপো জয় ভারতের, মার্শাল আর্টসে পদক জিতে ইতিহাস সুচিকার

হোলি মানেই রঙের উচ্ছ্বাস, আবির-গুলালের রঙিন মেলা। কিন্তু দেশের এক পাহাড়ি প্রান্তে ভরা বর্ষায় পালিত হয় একেবারে অন্যরকমের ‘হোলি’। সেখানে রঙের কোনও জায়গা নেই—একে অপরের গায়ে-মুখে মাখানো হয় খাঁটি মাখন, ছেটানো হয় ঘোল! সবুজ পাহাড়ি তৃণভূমিতে এমনই অভিনব উৎসবের নাম অন্দুরি উৎসব, যা স্থানীয়দের কাছে ‘মাখন হোলি’ (Butter Holi) বা ‘বাটার ফেস্টিভ্যাল’ (Butter Festival) নামে পরিচিত।

উত্তরাখণ্ডের উত্তরকাশী জেলার রাইথাল গ্রামের কাছে অবস্থিত মনোরম দায়ারা বুগিয়াল। স্থানীয় ভাষায় ‘বুগিয়াল’ বলতে বিস্তীর্ণ পাহাড়ি তৃণভূমি বা চারণভূমিকে বোঝায়। প্রতি বছর ভাদ্র সংক্রান্তির সময়, সাধারণত অগাস্ট মাসের মাঝামাঝিতে, এই সবুজ পাহাড়ি তৃণভূমিই হয়ে ওঠে মাখনের হোলির রঙ্গমঞ্চ।

আরও পড়ুন: 'খাম'-এর দাবি নিয়ে এবার হাই কোর্টের দ্বারস্থ ISF, চিঠি নির্বাচন কমিশনেও

এই উৎসবের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে রয়েছে পাহাড়ি মানুষের জীবিকা ও প্রকৃতির প্রতি তাঁদের কৃতজ্ঞতা। প্রতি বছর গ্রীষ্মের সময় রাইথাল গ্রামের বাসিন্দারা তাঁদের গবাদি পশু নিয়ে চলে যান দায়ারা বুগিয়ালে। কয়েক মাস ধরে সেখানকার সবুজ ঘাসে পশুগুলি চরে বেড়ায়। রাখালেরা সেই সময় অস্থায়ী তাঁবুতে থেকে পশুগুলির দেখাশোনা করেন। তারপর পশুগুলিকে সুস্থভাবে গ্রামে ফিরিয়ে আনার আনন্দেই এই উৎসবের আয়োজন। তাঁদের বিশ্বাস পাহাড়ের এই টাটকা ঘাস খেয়েই পশুরা সুস্থ থাকে এবং তাদের দুধের মান বহুগুণে উন্নত হয়। উৎসবটির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের কথাও। ভারতীয় পুরাণে শ্রীকৃষ্ণ মাখনচোর হিসেবে সুপরিচিত। তাই স্থানীয় মানুষ গবাদি পশুর সুস্থতা, দুধ ও মাখনের প্রভূত উৎপাদনের জন্য শ্রীকৃষ্ণ ও বুগিয়াল মাতার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

আরও পড়ুন: চলে গেলেন ‘কলকাতার রেখা’, দীর্ঘ লড়াই শেষে বিদায় নিলেন মিঠু

উৎসবের শুরু হয় পুজো ও প্রার্থনার মাধ্যমে। এরপর পাহাড়ি লোকসঙ্গীতের তালে ‘ধিমাই’ ও ‘মিঠি’ নাচ পরিবেশন করা হয়। এভাবেই নাচ এবং স্থানীয় সংস্কৃতির নানা পরিবেশনায় মেতে ওঠেন বাসিন্দারা। জন্মাষ্টমীর মতো দই-হাঁড়ি ভাঙার আয়োজনও থাকে। তবে সব আচার-অনুষ্ঠানের শেষে শুরু হয় উৎসবের সবচেয়ে আকর্ষণীয় পর্ব—মাখন হোলি।

রঙের বদলে তখন একে অপরের মুখে ও গায়ে মাখন মাখিয়ে দেন উৎসবের অংশগ্রহণকারীরা। কোথাও কোথাও চলে ঘোল ছেটানোর আনন্দও। কিছুক্ষণের মধ্যেই সবুজ পাহাড়ি তৃণভূমি যেন পরিণত হয় এক অনন্য হোলির আসরে। তবে এই হোলির রং লাল, নীল বা সবুজ নয়-এর প্রধান উপকরণ দুধের সাদা মাখন।

সময়ের সঙ্গে উৎসবের রীতিতেও এসেছে পরিবর্তন। স্থানীয় ঐতিহ্য অনুযায়ী, অতীতে মাখনের পাশাপাশি গোবর মাখানো বা ছোড়ার প্রথাও ছিল বলে জানা যায়। বর্তমানে অবশ্য সেই রীতি প্রায় উঠে গিয়েছে এবং মাখন ও ঘোলই হয়ে উঠেছে উৎসবের প্রধান আকর্ষণ।

আরও পড়ুন: উইঙ্কল টুইঙ্কল: ব্রাত্য যেন ভিত্তি, সৃজিত ভবিষ্যৎ

প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও অভিনব এই লোক উৎসবের টানে এখন পর্যটকরাও দায়ারা বুগিয়ালের দিকে পাড়ি দেন। ট্রেকিং, ক্যাম্পিং এবং পাহাড়ি সংস্কৃতির স্বাদ নেওয়ার পাশাপাশি পর্যটকদের কাছে মাখন হোলিতে অংশ নেওয়াও হয়ে উঠেছে বিশেষ আকর্ষণীয়।

ডিজিটাল যুগে যখন উৎসবের অনেক রীতি বদলে যাচ্ছে, তখন হিমালয়ের কোলে আজও টিকে রয়েছে প্রকৃতি, পশুপালন, লোকবিশ্বাস ও আনন্দের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এই প্রাচীন উৎসব। রঙের হোলি তো বহু জায়গাতেই দেখা যায়, কিন্তু ভরা বর্ষায় মাখনের হোলি-এই অভিজ্ঞতা যে সত্যিই একেবারে অন্যরকম তা বলাই বাহুল্য।