কলকাতা মানেই অলিগলিতে লুকিয়ে থাকা ইতিহাসের গন্ধ, আর উত্তর কলকাতা মানেই নস্টালজিয়ার সঙ্গে জিভের মেলবন্ধন। এইরকমই এক জীবন্ত ইতিহাস বহন করছে শ্যামবাজারের ৯০ বছরের পুরনো ঐতিহ্যবাহী ‘বড়ুয়া অ্যান্ড দে ফাস্ট ফুড সেন্টার’ (Barua & Dey Fast Food Centre) -এর মটন প্যান্থারাস (Mutton Pantheras), যা কলকাতার স্ট্রিট ফুড ইতিহাসের এক অমূল্য রত্ন। 

আরও পড়ুন: রুগ্ন পশুদের দেখে উদ্বেগ, আলিপুর চিড়িয়াখানার পরিকাঠামোয় ক্ষুব্ধ বনমন্ত্রী

১৯৩০-এর দশকে শ্যামবাজারের বিখ্যাত ‘থেটা-ফেটা ক্লাব’-এর তাস পেটানো বাবুদের সান্ধ্যকালীন আড্ডার আসর জমাতে তৈরি হয়েছিল এই পদ। আজ ক্লাব সংস্কৃতি হারিয়ে গেলেও, গ্রেট ইস্টার্ন হোটেলের প্রাক্তন রাঁধুনি নকুল চন্দ্র বড়ুয়ার হাত ধরে শুরু হওয়া সেই ব্রিটিশ আমলের অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান রেসিপি আজও এক ফোঁটাও ম্লান হয়নি। এখানে তৈরি হওয়া গরম গরম প্যান্থারাসের প্রতিটি কামড়ে রয়েছে এক চরম বিস্ময়। ওপরের ক্রিস্পি ও মুচমুচে বিস্কুটের গুঁড়োর কোটিং, তার ঠিক নিচেই ডিম ও ময়দার তৈরি নরম তুলতুলে ক্রেপ বা পাটিসাপটার মতো আস্তরণ, আর সবশেষে ভেতরে ঠাসা সুস্বাদু ও মশলাদার মটন কিমার পুর। এক টুকরো প্যান্থারাস মুখে দিলেই মনে পড়ে যায় পুরনো কলকাতার হারিয়ে যাওয়া বনেদিয়ানা। প্রতিদিন সন্ধ্যায় দোকান খোলার সাথে সাথেই শুরু হয় উপচে পড়া ভিড়, আর মাত্র দেড় থেকে দুই ঘণ্টার মধ্যেই শেষ হয়ে যায় এই জাদুকরী স্ন্যাক্স। এটি কেবল একটি খাবার নয়, এটি উত্তর কলকাতার এক আবেগের নাম। বর্তমানে অনলাইন অর্ডারের সুবিধাও চালু হয়েছে।

আরও পড়ুন: হিজাব ছাড়াই ১০ কিমি দৌড়! তেহরানে মহিলাদের অংশগ্রহণ ঘিরে আইনি পদক্ষেপ

তবে আপনি চাইলে এই সুস্বাদু রেসিপি বাড়িতেই তৈরি করে নিতে পারেন। কীভাবে তৈরি করবেন রইল রেসিপি। রেস্তোরাঁ বা দোকানের মতো পারফেক্ট স্বাদ বাড়িতে আনতে প্রথমেই যেটা মনে রাখবেন— কিমার পুর তৈরির সময় সমস্ত জল শুকিয়ে পুরোপুরি শুকনো ও ঝরঝরে করতে হবে, এবং ক্রেপ বা পাটিসাপটার ব্যাটারটি যেন খুব বেশি ঘন বা পাতলা না হয়।

পুরের জন্য মটন কিমা (২০০ গ্রাম), কুচানো পেঁয়াজ (২টি), আদা ও রসুন বাটা (১ চামচ করে), কাঁচা লঙ্কা কুচি/বাটা (১ চামচ), টমেটো পিউরি বা কুচি (১টি ছোট), হলুদ, লঙ্কা, জিরে ও ধনে গুঁড়ো (১/২ চামচ করে), গরম মশলা গুঁড়ো (১/২ চামচ), লেবুর রস (১ চামচ), ধনেপাতা কুচি, সর্ষের তেল এবং নুন (স্বাদমতো)।

ক্রেপ বা পাটিসাপটার জন্য ময়দা (৩/৪ কাপ), দুধ (১/২ কাপ), ডিম (১টি, ফেটানো), গোলমরিচ গুঁড়ো ও নুন (সামান্য)।

কোটিং ও ভাজার জন্য ডিম ২টি (সামান্য নুন-গোলমরিচ দিয়ে ফেটানো), প্রয়োজনমতো বিস্কুটের গুঁড়ো বা ব্রেডক্রাম্বস, ডিপ ফ্রাই করার জন্য সাদা তেল।

আরও পড়ুন: ফ্রিতে ফাংশন থেকে শয্যাসঙ্গী! টলিউডে দুই বিশ্বাসের কেলোরকীর্তি ফাঁস

প্রথমে প্যানে সর্ষের তেল গরম করে পেঁয়াজ কুচি হালকা করে ভাজুন। এবার আদা-রসুন বাটা, লঙ্কা বাটা ও টমেটো দিয়ে কষিয়ে নিন। সব গুঁড়ো মশলা ও নুন দিয়ে মশলা থেকে তেল ছাড়লে মটন কিমা যোগ করুন। অল্প আঁচে ঢাকা দিয়ে কিমা ভালো করে সেদ্ধ হওয়া পর্যন্ত রান্না করুন। কিমার সব জল শুকিয়ে মাখামাখা হয়ে এলে ওপর থেকে লেবুর রস, ধনেপাতা কুচি ও গরম মশলা ছড়িয়ে নামিয়ে ঠান্ডা করে নিন।

এবার একটি পাত্রে ময়দা, দুধ, ১টি ফেটানো ডিম, নুন, গোলমরিচ গুঁড়ো এবং সামান্য জল একসাথে ফেটিয়ে একটি মসৃণ ব্যাটার তৈরি করুন (ব্যাটারটি যেন পাটিসাপটার ব্যাটারের মতো পাতলা ও ঢালার উপযোগী হয়)। এবার একটি নন-স্টিক প্যানে সামান্য তেল ব্রাশ করে এক হাতা ব্যাটার দিয়ে প্যানটি ঘুরিয়ে গোল রুটির মতো ছড়িয়ে দিন। ক্রেপটি পুরোপুরি সেট হওয়ার আগেই এর মাঝখানে ২ চামচ মটন পুর লম্বাটে করে রাখুন।

আরও পড়ুন: ৫০ বছর পরে স্কুলের গেটে! পিঠে ব্যাগ নিয়ে ছুঁয়ে দেখা শৈশব

এবার ক্রেপের চারপাশ থেকে মুড়িয়ে একটি চারকোনা খামের বা চৌকো পার্সেলের মতো আকার দিন যাতে পুর বাইরে না আসে। প্যান থেকে নামিয়ে এটি কিছুক্ষণ ঠান্ডা হতে দিন। তারপর তৈরি করা চৌকো প্যান্থারাসগুলিকে প্রথমে ফেটানো ডিমের গোলায় ডোবান এবং তারপর বিস্কুটের গুঁড়োয় ভালো করে কোট করে নিন।  

কড়াইতে পর্যাপ্ত সাদা তেল গরম করে প্যান্থারাসগুলি মাঝারি আঁচে উল্টেপাল্টে একটু লালচে ও মুচমুচে করে ভেজে তুলুন। সবশেষে জিভে জল আনা গরম গরম মটন প্যান্থারাস পেঁয়াজ ও শশার স্যালাডের সঙ্গে পরিবেশন করুন।