বয়স তখন মাত্র ১৮ বছর। কাজের জায়গায় আচমকাই মারাত্মক দুর্ঘটনার কবলে পড়েন এক সহকর্মী শ্রমিক। আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাঁর প্রাণ বাঁচাতে জরুরি ভিত্তিতে রক্তের প্রয়োজন হয়ে পড়ে। কোনো কিছু না ভেবে সোজা হাসপাতালে ছুটে গিয়ে রক্ত দিয়েছিলেন এক তরুণ। তাঁর দেওয়া রক্তেই সেদিন অলৌকিকভাবে বেঁচে যায় সেই সহকর্মীর প্রাণ। সেই তরুণের নাম তরুণ শেখ, যার বয়স এখন ৫৩। 

আরও পড়ুন: EPS নিয়ে বড় বার্তা EPFO-র, কারা যোগ্য আর কারা নন?

পূর্ব বর্ধমানের কেতুগ্রামের বাসিন্দা পেশায় এই সাধারণ রাস্তা নির্মাণের মিস্ত্রি সেদিন যে যাত্রা শুরু করেছিলেন, তা আজ এক বিরল রেকর্ড স্পর্শ করেছে। জীবনের শত ব্যস্ততা ও অভাব-অনটনের মাঝেও বিগত ৩৫ বছর ধরে নিয়ম মেনে তিনি মোট ১০২ বার স্বেচ্ছায় রক্তদান করেছেন।

রক্তদানের সেঞ্চুরি পার করা এই প্রচারবিমুখ মানুষের নিঃস্বার্থ অবদান নজর এড়ায়নি রাজ্য স্বাস্থ্য দপ্তরের। সম্প্রতি কলকাতার স্বাস্থ্যভবনে আয়োজিত একটি বিশেষ অনুষ্ঠানে রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে তরুণ শেখকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। সেখানে উপস্থিত হয়ে রাজ্যের স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডাঃ শারদ্বত মুখোপাধ্যায় এই রক্তদাতাকে উত্তরীয় পরিয়ে সম্মানিত করেন এবং তাঁর হাতে বিশেষ পুরস্কার তুলে দেন।

আরও পড়ুন: পুজোর কলকাতায় রাতভর পানীয় জল, পুরসভাকে নির্দেশ অগ্নিমিত্রার

তরুণ শেখের রক্তদানের নেপথ্যে রয়েছে বহু মানুষের জীবন ফিরে পাওয়ার গল্প। প্রায় ছয় বছর আগে করোনা মহামারী ও লকডাউনের ভয়াল দিনগুলিতে কাটোয়ার পানুহাটের বাসিন্দা এক ৮৬ বছরের বৃদ্ধা শোভারানি তালুকদারের জরুরি রক্তের প্রয়োজন হয়। চারদিকে ব্লাড ব্যাঙ্ক যখন শূন্য এবং সংক্রমণের ভয়ে মানুষ যখন ঘরের বাইরে বের হতে রাজি ছিলেন না, তখন খবর পেয়ে কাটোয়া হাসপাতালে ছুটে যান তরুণ বাবু এবং রক্ত দিয়ে সেই বৃদ্ধার প্রাণ বাঁচান।

“রক্তদান করার জন্য এভাবে সম্মান পাব, কোনওদিন ভাবিনি। আর কোনো পুরস্কারের আশায় তো এই কাজ করিনি। তবে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর কাছ থেকে এই সম্মান পেয়ে আমার অনুপ্রেরণা আরও বেড়ে গেল। যতদিন শরীরে ক্ষমতা থাকবে, নিয়ম মেনে রক্তদান করে মানুষের জীবন বাঁচিয়ে যাব।”

আরও পড়ুন: নেপাল থেকে অর্ডার নেই! চিন্তায় শিলিগুড়ির মৃৎশিল্পীরা

তরুণ শেখ শুধু নিজে রক্ত দেন তাই নয় অন্যদেরকেও উদ্বুদ্ধ করেন। “রক্তদান মহৎ দান, একজনের দেওয়া রক্তে বেঁচে যেতে পারে অন্য আরেকজনের প্রাণ”। এই বার্তা দিতে তিনি নিয়মিত সাধারণ মানুষকেও রক্তদানে উদ্বুদ্ধ করেন।

পেশায় দিনমজুর হলেও মানুষের জীবন বাঁচানোর তাগিদে তরুণ শেখ আজ সমাজের কাছে এক বড় অনুপ্রেরণা। রক্তের অভাবে যাতে কোনও রোগীকে প্রাণ হারাতে না হয়, এটাই এখন তাঁর জীবনের একমাত্র লক্ষ্য।