বাংলার নিজস্ব ধর্মীয় সংস্কৃতি, পরম্পরা ও ঐতিহ্য রক্ষা করাই সরকারের মূল অগ্রাধিকার— শনিবার ন্যাশনাল লাইব্রেরি অডিটোরিয়ামে আয়োজিত ‘রাম শরদ কোঠারি প্রতিভা সম্মান ২০২৬’ প্রদান অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে এই স্পষ্ট বার্তা দিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। রাম জন্মভূমি আন্দোলনের শহিদ কোঠারি ভাইদের স্মরণ থেকে শুরু করে দুর্গাপুজোর শাস্ত্রীয় আচার, পরিবেশ সচেতনতায় বৃক্ষরোপণ এবং অভিন্ন দেওয়ানি বিধি (ইউসিসি)— একাধিক বিষয়ে নিজের ও প্রশাসনের অবস্থান তুলে ধরেন তিনি।
আলিপুর জাতীয় গ্রন্থাগারের অডিটোরিয়ামে রাম শরদ কোঠারি স্মৃতি সংঘের উদ্যোগে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে প্রধান বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের সরকার্যবাহ দত্তাত্রেয় হোসাবলে এবং প্রধান অতিথি ছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। সমাজ গঠনে অসামান্য অবদানের জন্য এ বছর এই সম্মাননা তুলে দেওয়া হয় পুরুলিয়ার বিদ্যাসাগর শিশু শিক্ষা নিকেতনের প্রধান শিক্ষক ঈশ্বরচন্দ্র হেমব্রম, ওড়িশার বিশিষ্ট পরিবেশকর্মী রমেশচন্দ্র মিশ্র এবং ঝাড়খণ্ডের ধ্যান ফাউন্ডেশনের হাতে।
১৯৯০ সালের রাম জন্মভূমি আন্দোলনের সময় অযোধ্যায় করসেবায় অংশ নিয়ে পুলিশের গুলিতে নিহত হয়েছিলেন কলকাতার বাসিন্দা দুই ভাই রাম কোঠারি ও শরদ কোঠারি। তাঁদের স্মরণে বাংলায় এখনও পর্যন্ত যোগ্য মর্যাদায় কোনো পদক্ষেপ না হওয়ায় আক্ষেপ প্রকাশ করেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, লখনউতে এই দুই ভাইয়ের নামে রাস্তার নামকরণ হলেও বাংলায় তাঁদের স্মরণ করার মতো উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ দেখা যায়নি। তাই এ রাজ্যে তাঁদের নামে প্রধান সড়কের নামকরণ এবং বিভিন্ন কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে স্মারক পুরস্কার চালু করা প্রয়োজন বলে সওয়াল করেন তিনি।
অনুষ্ঠানে রাজ্যের আসন্ন দুর্গাপুজো নিয়েও কড়া বার্তার পুনরাবৃত্তি শোনা যায় শুভেন্দুর গলায়। তিনি স্পষ্ট জানান, ধর্মীয় ঐতিহ্য ও শাস্ত্রীয় বিধান মেনে মাতৃপক্ষেই মণ্ডপ ও পুজোর উদ্বোধন সম্পন্ন করতে হবে, পিতৃপক্ষে মহালয়ার আগে কোনো পুজো উদ্বোধন করা যাবে না। পাশাপাশি বিসর্জনের ক্ষেত্রেও সংবেদনশীলতা বজায় রাখার আহ্বান জানিয়ে তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে প্রতিমা নিরঞ্জনে ক্রেন ব্যবহারের প্রথা বন্ধ করার সিদ্ধান্ত আগেই নেওয়া হয়েছে এবং কলকাতা পুরসভাকে উপযুক্ত বিকল্প ও শালীন ব্যবস্থার মাধ্যমে বিসর্জন সম্পন্ন করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ‘মায়ের নামে একটি গাছ’ কর্মসূচির গুরুত্ব তুলে ধরে পরিবেশ রক্ষায় বিশেষ উদ্যোগের কথাও জানান মুখ্যমন্ত্রী। উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথের প্রসঙ্গ টেনে তিনি কিছুটা রসিকতার সুরেই বলেন, বৃক্ষরোপণ নিয়ে উত্তরপ্রদেশের সঙ্গে বাংলার সুস্থ প্রতিযোগিতা চলছে। উত্তরপ্রদেশ যেখানে ২৬ কোটি গাছ লাগানোর কর্মসূচি নিয়েছে, সেখানে বাংলাও ১০ কোটি গাছ লাগানোর সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে এগোচ্ছে।
রাজ্যে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি (ইউসিসি) কার্যকর করার বিষয়েও গুরুত্বপূর্ণ দাবি করেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য, এই সংক্রান্ত কমিশন বর্তমানে কাজ করছে এবং আগামী তিন থেকে চার মাসের মধ্যে প্রয়োজনীয় রূপরেখা চূড়ান্ত হতে পারে। এরপর রাজ্য সরকার তা কার্যকর করার পথে হাঁটবে। পাশাপাশি বাগেশ্বর ধামের ধীরেন্দ্র কৃষ্ণ শাস্ত্রীর অতীতের বিতর্কিত ঘটনার প্রসঙ্গ টেনে তিনি আশ্বাস দেন, বাংলার পুণ্যভূমিতে কোনো সাধুসন্তের অমর্যাদা বা অপমান সরকার কোনোভাবেই বরদাস্ত করবে না। সামগ্রিক বক্তব্যে রাজ্যের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির সুরক্ষাকেই উন্নয়নের পাশাপাশি প্রশাসনের প্রধান স্তম্ভ হিসেবে তুলে ধরেন তিনি।















