সমাজ, রাষ্ট্র ও শাসনব্যবস্থাকে সঠিকভাবে বুঝতে এবং বিশ্লেষণ করতে হলে নিয়মিত বই পড়ার কোনও বিকল্প নেই। মঙ্গলবার যাদবপুরে ‘মার্কসীয় ও প্রগতিশীল পুস্তক বিক্রয় কেন্দ্র’-এর উদ্বোধনী ভাষণে এভাবেই দেশ ও রাজ্যের বর্তমান পরিস্থিতির সমালোচনা করে সাধারণ মানুষকে বই পড়ার আহ্বান জানালেন বামফ্রন্ট চেয়ারম্যান বিমান বসু। উৎসবের আবহে ধর্মীয় মেরুকরণ, খাদ্যাভ্যাসে নাক গলানো এবং রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতার বিরুদ্ধে তাঁর স্পষ্ট বক্তব্য, জোর করে কোনও ফরমান চাপিয়ে সমাজ চালানো যায় না।

প্রগতিশীল চিন্তার ওপর প্রশাসনিক কোপের ইঙ্গিত দিয়ে এদিন বিমান বসু বলেন, জানান, বহুকাল ধরে চলা এই বুক স্টলের নাম ‘মার্কসীয় ও প্রগতিশীল পুস্তক বিক্রয় কেন্দ্র’। কিন্তু বর্তমান ডাবল ইঞ্জিন সরকারের পক্ষ থেকে হঠাৎ বলা হচ্ছে এই নামে স্টল করা যাবে না। স্টলে শিশুদের বই রাখার গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি নিজের এক চিকিৎসকের আত্মীয়ের উদাহরণ টেনে বলেন, পড়াশোনা না করলে যেমন কেউ ডাক্তার হতে পারে না, তেমনই সমাজবিজ্ঞানের ধারা বা আড্ডার বিষয়বস্তু সমৃদ্ধ করতে হলেও পড়া দরকার। নিছক একটি জনগোষ্ঠী থাকলেই রাষ্ট্র গড়ে ওঠে না, তার জন্য নির্দিষ্ট ভূখণ্ড ও ভাষার নিয়মনীতি লাগে—এই উপলব্ধিগুলো তৈরি হয় পড়াশোনার মাধ্যমেই।

সাম্প্রতিক ধর্মীয় আড়ম্বর ও চণ্ডীপাঠের বাণিজ্যিকীকরণের কড়া সমালোচনা করে তিনি বলেন, শুধু ‘যা দেবী সর্বভূতেষু’ শ্লোক আওড়ালেই সব হয়ে যায় না, তার অনুসারী জীবনযাপন করতে হয়। বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের স্মৃতিচারণ করে তিনি মনে করিয়ে দেন, বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের জীবনযাত্রা ও বাচনভঙ্গি ছিল অত্যন্ত সংযত ও সাদামাটা। তিনি শুধু অর্থের লোভে চণ্ডীপাঠ করতেন না। অথচ আজ সমাজের সবকিছুই পয়সার বিনিময়ে পরিচালিত হচ্ছে, যা সভ্যতাকে রসাতলে নিয়ে যাচ্ছে। আলিমুদ্দিন স্ট্রিটের দলীয় কার্যালয়ের অদূরে সাম্প্রতিক চণ্ডীপাঠের আয়োজন প্রসঙ্গে তিনি স্পষ্ট জানান, পার্টি অফিসের ভেতরে কিছু হয়নি, চার্চের সামনের ফুটপাতে মঞ্চ করে তা হয়েছে। অর্থের বিনিময়ে কয়েকজন এসে মাইক লাগিয়ে দীর্ঘক্ষণ চণ্ডীপাঠ করে গেছেন। যে পাড়ায় মানুষ এতে অভ্যস্ত নয়, সেখানে জোর করে এটা শোনানো ছাড়া উপায় ছিল না।

বাঙালিয়ানা ও খাদ্যাভ্যাস নিয়ে চলা বিতর্কে সুর চড়িয়ে প্রবীণ এই নেতা নিজের ব্যক্তিগত জীবনের উদাহরণ দেন। তিনি বলেন, বেশভূষা ও ব্যবহারে তিনি খাঁটি বাঙালি হলেও খাদ্যাভ্যাসে ভাত এড়িয়ে চলেন। ৩৬৫ দিন ভাতের সঙ্গে আড়ি রেখেও ৮৬ বছর বয়সে তিনি সুস্থ আছেন। তাঁর সওয়াল, কে কী খাবে বা পছন্দ করবে, তা নিয়ে ফতোয়া দেওয়ার অধিকার কারও নেই। বিশ্বের কোনও দেশে খাবারের ওপর এমন সরকারি ফরমান জারি হয় না, ভারতেও তা হওয়া উচিত নয়।
দিল্লির যন্তর মন্তরে প্রতিবাদীদের গ্রেফতার ও সভা করতে না দেওয়ার প্রসঙ্গ টেনে তিনি দেশের বর্তমান গণতান্ত্রিক পরিবেশ নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, দেশ কোন দিকে এগোচ্ছে তা বুঝতে এবং তার সঠিক বিশ্লেষণ করতে বই পড়া জরুরি। এই প্রেক্ষাপটেই সমস্ত অংশের মানুষকে আরও বেশি করে বই কেনা ও পড়ার আহ্বান জানান তিনি।
এ দিনের অনুষ্ঠানে যাদবপুরের এই ঐতিহ্যবাহী বুক স্টল মঞ্চে বিমান বসু, অভিনেতা সব্যসাচী চক্রবর্তী, শতরূপ ঘোষের উপস্থিতিতে শুভ্রতো দাশগুপ্তের লেখা নতুন গ্রন্থ ‘চক্রব্যূহ’ আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশিত হয়। লেখক জানান, বামফ্রন্টের ৩৪ বছরের শাসনকালে সরকারকে উৎখাত করার যে গভীর ষড়যন্ত্র হয়েছিল এবং বিজন সেতু, তিলজলা বা পুরুলিয়া অস্ত্রবর্ষণের নেপথ্যে থাকা বাস্তব ইতিহাসকে উপন্যাসের আদলে এই বইয়ে ধরা হয়েছে। অভিনেতা সব্যসাচী চক্রবর্তীও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সার্বিক শিক্ষার ওপর আক্রমণের বিরুদ্ধে সরব হয়ে সুস্থ সমাজ গড়তে সাধারণ মানুষের হাতে বই তুলে দেওয়ার আর্জি জানান। আয়োজকদের তরফে জানানো হয়, কলকাতার ৩৫টি প্রকাশনীর বই নিয়ে আগামী ২২ তারিখ পর্যন্ত টানা দশ দিন চলবে এই বিক্রয় শিবির।















