স্বাধীনতা সংগ্রাম ও দেশভাগের ইতিহাসকে নিজেদের রাজনৈতিক ছাঁচে ফেলে নতুন করে লেখার চেষ্টা করছে বিজেপি— এই অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এবার সেই ‘ইতিহাস বিকৃতি’ ও মেরুকরণের রাজনীতিতেই কি পরোক্ষে সিলমোহর দিচ্ছে রাজ্য সরকার? আগামী ১৩ ও ১৪ অগাস্ট রাজ্যজুড়ে প্রথমবার ‘পার্টিশন হরর রিমেমব্র্যান্স ডে’ বা ‘দেশভাগ বিভীষিকা স্মরণ দিবস’ পালনের সরকারি নির্দেশিকা প্রকাশ্যে আসতেই তীব্র হয়ে উঠেছে প্রশ্ন। কেন্দ্রের মোদি সরকারের সংস্কৃতি মন্ত্রকের চিঠির ভিত্তিতে খোদ নবান্নের এই তড়িঘড়ি পদক্ষেপে রাজনৈতিক মহলে শুরু হয়েছে তীব্র জল্পনা। 

দীর্ঘদিন ধরেই বিজেপি ও সংঘ পরিবার ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসকে নিজেদের মতো করে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। সমালোচকদের মতে, স্বাধীনতা আন্দোলনে নিজেদের ভূমিকা নগণ্য হওয়ায়, দেশভাগের যন্ত্রণাময় এবং রক্তস্নাত ইতিহাসকে হাতিয়ার করে তারা এক নতুন মেরুকরণের আখ্যান তৈরি করতে চাইছে। দেশভাগের নেপথ্যে থাকা সাম্রাজ্যবাদী চক্রান্ত এবং আর্থ-সামাজিক কারণগুলিকে আড়াল করে, কেবল সাম্প্রদায়িক হিংসাকে বড় করে দেখিয়ে বর্তমানের রাজনৈতিক ফায়দা লোটাই এই ‘বিভীষিকা স্মরণ’-এর মূল উদ্দেশ্য বলে মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।

সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হল রাজ্য সরকারের ভূমিকা। যে তৃণমূল সরকার কথায় কথায় কেন্দ্রের বিরুদ্ধে বঞ্চনা ও স্বৈরাচারের অভিযোগ তোলে, তারা হঠাৎ কেন কেন্দ্রের সংস্কৃতি মন্ত্রকের নির্দেশিকায় এমন সুবোধ বালকের মতো মাথা নোয়াল? তথ্য ও সংস্কৃতি দফতরের সচিব ড. সৌমিত্র মোহনের জারি করা নির্দেশিকায় স্পষ্ট বলা হয়েছে, কেন্দ্রের চিঠির পরিপ্রেক্ষিতেই এই সিদ্ধান্ত। মুখ্যমন্ত্রী ও রাজ্যপালের সাম্প্রতিক নানা টানাপোড়েন এবং বক্তব্যের পর, সরকারের এই আকস্মিক উদ্যোগ রাজনৈতিক মহলে ‘সেটিং’-এর জল্পনাকে আরও উসকে দিয়েছে। প্রশ্ন উঠছে, তবে কি দিল্লির নির্দেশ মেনেই রাজ্যে দেশভাগের ইতিহাস নিয়ে বিজেপির হিন্দুত্ববাদী ব্লু-প্রিন্ট বাস্তবায়নের পথ প্রশস্ত করে দিচ্ছে রাজ্য প্রশাসন?

নির্দেশিকা অনুযায়ী, ১৪ অগস্ট সন্ধ্যায় জেলা সদরে সরকারি আধিকারিক, পড়ুয়া ও সাধারণ মানুষকে নিয়ে মোমবাতি মিছিল হবে। ১৩ ও ১৪ অগস্ট দেশভাগের ইতিহাস, উদ্বাস্তুদের সংগ্রাম নিয়ে প্রদর্শনী ও তথ্যচিত্র দেখানো হবে। অথচ এই বিরাট কর্মকাণ্ডের জন্য প্রতিটি জেলার জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে মাত্র ৩০ হাজার টাকা! যে দেশভাগে লক্ষ লক্ষ মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন, ভিটেমাটি ছেড়ে ছিন্নমূল হয়েছেন অগণিত মানুষ, তাঁদের সেই চরম আত্মত্যাগ ও যন্ত্রণাকে মাত্র ৩০ হাজার টাকার এক সরকারি ইভেন্টে বেঁধে ফেলার এই চেষ্টা আদতে এক নিষ্ঠুর প্রহসন ছাড়া আর কিছুই নয়। 

দেশভাগের ক্ষত বাঙালির মনে আজও দগদগে। সেই ইতিহাসকে স্মরণ করার অধিকার সকলের রয়েছে। কিন্তু যখন সেই স্মরণের নেপথ্যে থাকে ইতিহাসকে বিকৃত করে রাজনৈতিক ফায়দা তোলার সর্বভারতীয় ব্লু-প্রিন্ট, এবং যখন বিরোধী শাসিত রাজ্য সরকারও বিনা বাক্যব্যয়ে সেই ফিনিক ফোটা চিত্রনাট্যে অংশ নেয়, তখন তা সাধারণ মানুষের কাছে চরম উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। দেশভাগের যন্ত্রণাকে কি তবে নিছকই ভোটব্যাঙ্কের রাজনীতির ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে? আগামী দিনে এই প্রশ্নই রাজ্য রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু হতে চলেছে।