অবশেষে আত্মসমর্পণ! দু'দশকের সশস্ত্র মাওবাদী (Maoist) জীবন ছেড়ে এবার সমাজের মূলস্রোতে ফেরার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন মাওবাদী দম্পতি শচীন ওরফে রামপ্রসাদ মাণ্ডি (Ramprasad Mandi) এবং মিতা (Mita) ওরফে নয়নতারা। দু’জনের মাথার দাম ছিল মোট ২৫ লক্ষ টাকা। ঝাড়খণ্ড পুলিশের (Jharkhand Police) লাগাতার অভিযানের চাপেই এই সিদ্ধান্ত বলে জানা গিয়েছে। কয়েক দিনের মধ্যেই বাংলায় তাঁদের আনুষ্ঠানিক আত্মসমর্পণ হতে পারে বলে সূত্রের খবর।
আরও পড়ুন: ব্রিকস সংস্কারে বড় ঘোষণা, গ্লোবাল সাউথকে নেতৃত্ব দেওয়ার বার্তা মোদির
পূর্ব সিংভূমের পটমদার বাসিন্দা শচীন ছিলেন সিপিআই (মাওবাদী)-র বাংলা-ঝাড়খণ্ড-ওড়িশা আঞ্চলিক কমিটির সদস্য। ঝাড়খণ্ডের বিভিন্ন থানায় তাঁর বিরুদ্ধে ৪৪টি মামলা রয়েছে। দীর্ঘদিন AK-47 নিয়ে সংগঠনের হয়ে কাজ করেছেন তিনি। তাঁর স্ত্রী মিতা পূর্ব মেদিনীপুরের নন্দীগ্রামের সোনাচূড়ার বাসিন্দা। পূর্ব সিংভূম এরিয়া কমিটির এই সদস্যের বিরুদ্ধে ১৯টি মামলা রয়েছে। তাঁর মাথার দাম ছিল ১০ লক্ষ টাকা। মিতার হাতে থাকত ইনসাস রাইফেল।
অভাবের সংসারে বেড়ে ওঠা শচীন স্কুলে পড়ার সময় থেকেই মাওবাদী মতাদর্শের প্রতি আকৃষ্ট হন। ২০০৬ সালে সরাসরি সংগঠনে যোগ দেন তিনি। অন্যদিকে, ২০০৭ সালের নন্দীগ্রাম আন্দোলনের সময় মাতঙ্গিনী মহিলা সমিতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন মিতা। সেখান থেকেই ঝাড়খণ্ডে গিয়ে সশস্ত্র স্কোয়াডে যোগ দেন। পরে ডামপাড়া স্কোয়াডের কমান্ডারও হন তিনি।
আরও পড়ুন: আপ-সিজেপি ‘সখ্যতা’: বিজেপির সুরেই সরব কংগ্রেস
লালগড় আন্দোলনের সময় বেলপাহাড়ির জঙ্গলে দু’জনের পরিচয়। সেই সময় মাওবাদী নেতা কিষানজির ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ছিলেন শচীন। গোয়েন্দা সূত্রের দাবি, সংগঠনের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ অভিযানে তাঁর ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। সাঁকরাইল থানায় হামলা, শিলদা ইএফআর ক্যাম্পে হামলা এবং তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের কনভয়ে হামলার মতো ঘটনায় তাঁর নাম উঠে এসেছে। সাংগঠনিক দক্ষতার কারণে পরে তাঁকে বাংলা-ঝাড়খণ্ড-ওড়িশা আঞ্চলিক কমিটির গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হয়।
এই সময়েই শচীন ও মিতার সম্পর্ক তৈরি হয়। ২০১০ সালে পুরুলিয়ার বান্দোয়ান থানার বুড়িঝোরের জঙ্গলে তাঁদের ‘কমরেড ম্যারেজ’ হয়। ২০১১ সালে রাজ্যে তৃণমূল ক্ষমতায় আসার পর যৌথবাহিনীর অভিযানে কিষানজির মৃত্যু হয়। এরপর মাওবাদীদের শক্তি ক্রমশ কমতে থাকে। বাহিনীর চাপ বাড়ায় ২০১৮ সাল নাগাদ শচীন-মিতা দলমা পাহাড় থেকে সরাইকেল্লা-খরসোওয়া, কোলহান হয়ে পশ্চিম সিংভূমের দুর্গম সারাণ্ডার জঙ্গলে চলে যান। সেখান থেকেই দীর্ঘদিন সংগঠনের কার্যকলাপ চালিয়ে যান তাঁরা।
চলতি বছরও বাহিনীর অভিযান এড়িয়ে বেশ কিছুদিন গোপন ডেরায় ছিলেন ওই দম্পতি। বঙ্গ ব্রিগেডের জঙ্গল অভিযান এবং পরবর্তী পুলিশি ধরপাকড়ের পর পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে ওঠে। একাধিক অভিযান সত্ত্বেও কিছুদিন পাহাড়ের গোপন জায়গায় আত্মগোপন করে ছিলেন শচীন ও মিতা।
শেষ পর্যন্ত ধারাবাহিক পুলিশি অভিযানের চাপে ২০ বছরের সশস্ত্র জীবন শেষ করার সিদ্ধান্ত নিলেন তাঁরা। শুক্রবার শচীনের বাবা সনাতন মাণ্ডির কথাতেও ফুটে উঠেছে সেই আবেগ। তাঁর কথায়, এত বছর ধরে ছেলেকে খুঁজেছেন। মৃত্যুর আগে ছেলেকে আবার সমাজের মূলস্রোতে দেখতে চেয়েছিলেন। পুলিশ এসে ছেলে ও বউমা ফিরে আসার খবর দেওয়ায় গোটা পরিবার এখন খুশি।
শচীন-মিতার আত্মসমর্পণ শুধু তাঁদের পরিবারের কাছেই নয়, বাংলা ও ঝাড়খণ্ডের পুলিশ প্রশাসনের কাছেও বড় স্বস্তির খবর। দীর্ঘদিনের দুই শীর্ষ মাওবাদীর অস্ত্র ছেড়ে মূলস্রোতে ফেরার সিদ্ধান্তে জঙ্গলমহল ও সংলগ্ন এলাকায় মাওবাদী সংগঠনের উপর চাপ আরও বাড়ল।
















