মুখে নারীশক্তির জয়গান, আর কাজে শর্তের পর শর্তের জাঁতাকল! 'অন্নপূর্ণা যোজনা' নিয়ে ফের একবার সরকারের আসল চেহারাটা প্রকাশ্যে চলে এল। ১০ হাজার টাকার বেশি রোজগার করলেই মিলবে না ভাতা— মুখ্যমন্ত্রীর এই ঘোষণায় এখন মাথায় হাত রাজ্যের খেটেখাওয়া মহিলাদের। প্রশ্ন উঠছে, বর্তমান অগ্নিমূল্য বাজারে মাসে ১০ হাজার টাকা রোজগার কি সত্যিই কোনও আভিজাত্যের লক্ষণ? নাকি ভাঁড়ারে টান পড়ায় এটা স্রেফ ভাতা ছাঁটাইয়ের এক নিষ্ঠুর ফন্দি?
একদিকে সরকার গলা ফাটিয়ে বলছে, নারীদের অর্থনৈতিকভাবে স্বনির্ভর করা হবে। অন্যদিকে, যে নারী নিজে হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে, সেলাই করে, টিউশন পড়িয়ে বা ছোটখাটো কাজ করে মাসে ১০-১১ হাজার টাকা ঘরে আনছেন, তাঁকে এই যোজনার বাইরে ছুঁড়ে ফেলা হচ্ছে! অর্থাৎ, সরকার কি পরোক্ষে এটাই বুঝিয়ে দিল যে, সরকারি সাহায্য পেতে হলে আপনাকে গরিব এবং পরনির্ভরশীলই থাকতে হবে? নিজের পায়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে একটু বেশি রোজগার করলেই জুটবে বঞ্চনা! স্বনির্ভরতায় এর চেয়ে বড় 'শাস্তি' আর কী হতে পারে?
যেখানে বাজারে চাল, ডাল, সবজি থেকে শুরু করে ওষুধের দাম আকাশছোঁয়া, গ্যাস সিলিন্ডারের দাম মধ্যবিত্তের পকেট পোড়ায়, সেখানে ১০ হাজার টাকায় একটা সংসার এক সপ্তাহও ঠিকমতো চলে না। এই আয়ের মাপকাঠি বেঁধে দেওয়াটা আসলে দরিদ্র এবং নিম্ন-মধ্যবিত্ত মহিলাদের সঙ্গে এক চরম রসিকতা। যে মহিলারা দিনরাত এক করে সংসারের ঘানি টানছেন এবং সামান্য কিছু বাড়তি রোজগারের চেষ্টা করছেন, এই শর্ত তাঁদের আত্মসম্মানে সরাসরি আঘাত।
সরকারের এই শর্তের গেরো বুঝিয়ে দিচ্ছে, 'নারী সশক্তিকরণ'-এর বুলিটা আদতে কতটা ফাঁপা। ৩ হাজার টাকার ভাতার টোপ দিয়ে আসলে এমন এক পরিস্থিতি তৈরি করা হচ্ছে, যেখানে মহিলারা সরকারি দাক্ষিণ্যের ওপর নির্ভরশীল হয়েই বেঁচে থাকতে বাধ্য হন। মহিলাদের উচ্চাকাঙ্ক্ষা বা নিজের পায়ে দাঁড়ানোর জেদকে এই ১০ হাজার টাকার সিলিং দিয়ে আক্ষরিক অর্থেই গলা টিপে মারা হচ্ছে। যাঁরা এতদিন ভেবেছিলেন অন্নপূর্ণা যোজনা প্রকৃত অর্থেই বাংলার নারীদের মুশকিল আসান করবে, তাঁদের মোহভঙ্গ হতে আর বাকি নেই। মুখ্যমন্ত্রীর এই ঘোষণা স্পষ্ট করে দিল, প্রতিশ্রুতির মোড়কে মোড়া এই যোজনা আসলে শর্তের কাঁটায় বিদ্ধ। ক্ষমতায়নের এই 'মডেল'-এ নারীদের মাথা তুলে দাঁড়ানোর অধিকার নেই, আছে কেবল শর্ত মেনে হাত পাতার বাধ্যবাধকতা!
















