বাড়িটা একই আছে। বদলায়নি দরজা-জানালা, কমেনি মানুষের আনাগোনাও। রাজনৈতিক পরিবারের বাড়ির দরজা এখনও আগের মতোই রয়েছে খোলা। শুধু বদলে গিয়েছে ঘরের ভিতরের ছবিটা। যে মা সকাল থেকে রাত পর্যন্ত দুই সন্তানকে ঘিরে ব্যস্ত থাকতেন, সংসার সামলানোর পাশাপাশি পরিবারের ব্যবসার দায়িত্বও দেখতেন, তাঁর জায়গাটা এখন ফাঁকা। আর সেই শূন্যতার মধ্যেই মায়ের ফেরার অপেক্ষায় দিন গুনছে কাঁচরাপাড়ার রায় পরিবার। ১০ দিন পেরিয়ে গিয়েছে। নেপালে হড়পা বানের পর থেকে নিখোঁজ শুভ্রাংশু রায়ের স্ত্রী শর্মিষ্ঠা রায় ভৌমিকের (Sarmistha Roy)এখনও কোনও সন্ধান মেলেনি। সময় যত গড়াচ্ছে, ততই বাড়ছে পরিবারের উৎকণ্ঠা। কাঁচরাপাড়ার ঘটক রোডের বাড়িতে এখন একটাই অপেক্ষা—কখন দরজায় ফিরবেন শর্মিষ্ঠা। বারবার মায়ের কথা জিজ্ঞাসা করছে তাঁর ১০ বছরের ছেলে। দিদি তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছে। কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই বাবার কাছে ফের একই প্রশ্ন, ‘‘মায়ের কোনও খবর পাওয়া গেল?’’ পরিবারের কাছে যার কোনও উত্তর নেই। শুধু অপেক্ষা আর প্রার্থনা—শর্মিষ্ঠা (Sarmistha Roy)যেন সুস্থ শরীরে দ্রুত বাড়ি ফিরে আসেন।
রাজনৈতিক পরিবারে বিয়ে হলেও রাজনীতির ব্যস্ততা খুব একটা পছন্দ করতেন না শর্মিষ্ঠা। তাঁর শ্বশুর প্রয়াত মুকুল রায় ছিলেন বঙ্গ রাজনীতির পরিচিত মুখ। স্বামী শুভ্রাংশু রায়ও বীজপুরের প্রাক্তন বিধায়ক। ফলে বাড়িতে রাজনৈতিক কর্মী-সমর্থকদের আনাগোনা ছিল নিত্যদিনের। সেই ব্যস্ততার বাইরে শর্মিষ্ঠা নিজের মতো করে সময় কাটাতেন এবং বেড়াতে ভালোবাসতেন। তবে সংসার ও সন্তানদের দায়িত্বে তাঁর ব্যস্ততার কমতি ছিল না। দুই সন্তানের পড়াশোনা, স্কুল, কোচিং থেকে শুরু করে মেয়েকে নাচের স্কুলে নিয়ে যাওয়া—দৈনন্দিন এই কাজগুলির বড় অংশই সামলাতেন তিনি। পাশাপাশি পরিবারের বেসরকারি ইংরেজি মাধ্যম স্কুল, পলিক্লিনিক ও চক্ষু পরীক্ষা কেন্দ্রের ব্যবসার দেখভালও করতেন শর্মিষ্ঠা। তাঁর অনুপস্থিতিতে তাই শুধু একজন মানুষ নয়, যেন থমকে গিয়েছে গোটা সংসারের ছন্দ। শর্মিষ্ঠার ১৬ বছরের মেয়ে নিজেকে শক্ত রাখার চেষ্টা করছে। ছোট ভাইকে আগলে রাখছে সে-ই। কিন্তু ভাইয়ের মুখে মায়ের কথা উঠলেই তার নিজেরও অসহায় লাগছে।
মায়ের অনুপস্থিতিতে দুই সন্তানকে আগলে রেখেছেন শুভ্রাংশু এবং শর্মিষ্ঠার মা। মেয়ের নিখোঁজ হওয়ার খবর পাওয়ার পর বেলঘরিয়ার বাড়ি ছেড়ে কাঁচরাপাড়ায় চলে এসেছেন বৃদ্ধা মা। জানা গিয়েছে, গত ২১ অগস্ট ৩২ জনের একটি দলের সঙ্গে নেপালের ( Nepal) উদ্দেশে রওনা হয়েছিলেন শর্মিষ্ঠা। সেখানে পৌঁছে নিয়মিত স্বামী, সন্তান এবং মায়ের সঙ্গে ফোন ও ভিডিয়ো কলে যোগাযোগ রাখছিলেন। কিন্তু নেপালে হড়পা বান ( Nepal Flood)আসার পর আচমকাই তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। তারপর থেকেই চলছে খোঁজ। কল্যাণীর (Kalyani) একটি বেসরকারি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে পড়ার সময় শর্মিষ্ঠার সঙ্গে শুভ্রাংশুর পরিচয়। সেই পরিচয় থেকে প্রেম এবং পরে বিয়ে। ২০০৯ সাল নাগাদ তাঁদের বিয়ে হয়। তাঁদের দুই সন্তান ব্যান্ডেলের একটি বেসরকারি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে পড়ে। ভ্রমণও ছিল শর্মিষ্ঠার অন্যতম পছন্দ। কখনও একা, কখনও সন্তানদের নিয়ে, আবার কখনও পরিজনদের সঙ্গে বেড়াতে গিয়েছেন তিনি। প্রায় দেড় বছর আগে দুই সন্তানকে নিয়ে লাদাখেও গিয়েছিলেন। নেপাল সফর শেষে পুজোর ছুটিতে সন্তানদের নিয়ে বিদেশে যাওয়ার পরিকল্পনাও ছিল তাঁর। কিন্তু সেই পরিকল্পনা এখন থমকে রয়েছে। নেপাল থেকে মায়ের ফেরার অপেক্ষায় দিন গুনছে দুই সন্তান, আর কাঁচরাপাড়ার বাড়িতে প্রার্থনা একটাই— সুস্থ ভাবে ফিরে আসুন শর্মিষ্ঠা।
















