সময় বদলেছে, বদলেছে চারপাশের চেনা ছবি। কিন্তু ইটাহারের দুর্গাপুরের (Durgapur) ভূপালপুর রাজবাড়িতে পা রাখলে যেন কয়েক শতক পিছিয়ে যাওয়া যায়। ইতিহাসের পাতায় হারিয়ে যাওয়া জমিদারি আমলের সেই জৌলুস আজও টিকে রয়েছে রাজবাড়ির দুর্গাপুজোয় (Durga Puja)। এই পুজো শুধু দেবীর আরাধনা নয়, উত্তর দিনাজপুরের (North Dinachpur) মাটিতে বেঁচে থাকা এক জীবন্ত ইতিহাস এবং বহু প্রজন্মের পরম্পরার স্মারক।
আরও পড়ুন: সুপারস্টার নন, দেব তো ঘরের নাতি! শিলিগুড়িতে দেবকে ভালোবাসার চুমু ৮০ বছরের বৃদ্ধার
রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায় চৌধুরী ও ভূপাল চন্দ্র রায় চৌধুরীর উত্তরসূরিদের হাত ধরে যে পুজোর সূচনা, সময়ের স্রোত পেরিয়েও তার ঐতিহ্য অটুট। ইতিহাস বলছে, একসময় ইটাহারের চূড়ামন এলাকায় ছিল ভূপালপুর রাজপরিবারের পুরনো রাজবাড়ি। কিন্তু মহানন্দা নদীর ভাঙনে একদিন সেই রাজপ্রাসাদ ও রাজ্যপাট তলিয়ে যায় নদীগর্ভে। পরে দুর্গাপুরে (Durgapur) নতুন করে গড়ে ওঠে রাজবাড়ি ও মন্দির। সেই নতুন ঠিকানাতেই ফের প্রাণ ফিরে পায় রাজপরিবারের দুর্গাপুজো।
এই পুজোর অন্যতম বৈশিষ্ট্য এর সাবেকিয়ানা। আধুনিকতার ছোঁয়ায় বদলে যায়নি প্রতিমার রূপ বা পুজোর আবহ। আজও একচালার কাঠামোয় ডাকের সাজে সেজে ওঠেন দেবী দুর্গা। প্রতিমার মাথার উপরে দেখা যায় ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও মহেশ্বরকে। আর এখানকার অসুরও একেবারেই স্বতন্ত্র। প্রচলিত লাল বা খয়েরি রঙের বদলে ঘন সবুজ রঙে সাজানো হয় অসুরকে। সব মিলিয়ে প্রতিমার সাজে রয়েছে রাজবাড়ির নিজস্ব ঐতিহ্যের ছাপ। সময় অবশ্য কিছুটা বদল এনেছে পুজোর আচারেও। একসময় মহালয়া থেকেই শুরু হয়ে যেত দেবীর আগমনপর্ব। ছিল জোড়া মোষ ও পাঠাবলির রীতিও। এখন সেই প্রথা অতীত। বর্তমানে মহাষষ্ঠীর বোধনের মধ্য দিয়েই পুজোর আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়। বলিপ্রথাও সম্পূর্ণ বন্ধ। তবে আচার-অনুষ্ঠানের ধরন বদলালেও পুজোর নিয়ম-নিষ্ঠা ও ঐতিহ্যের মূল সুরে কোনও পরিবর্তন আসেনি।
আর নবমী এলেই ভূপালপুর রাজবাড়ির পুজোয় যোগ হয় এক অন্য মাত্রা। পুজোর পর দেবীর বিশেষ ভোগ ও ফলমূল ঠাকুরদালানের উঁচুতে বেঁধে দেওয়া হয়। এরপর তা সংগ্রহ করতে আনন্দে মেতে ওঠেন গ্রামবাসী ও রাজপরিবারের সদস্যরা। যে যেভাবে পারেন, উঁচুতে বাঁধা সেই ভোগ ও ফলমূল সংগ্রহ করেন। হাসি, উচ্ছ্বাস আর মিলনমেলার আবহে নবমীর এই আয়োজন হয়ে ওঠে পুজোর অন্যতম আকর্ষণ। রাজপরিবারের সদস্য অভিষেক রায়চৌধুরীর কথায়, এই পুজো শুধুমাত্র ধর্মীয় আচার নয়। এলাকার মানুষকে একত্রিত করারও অন্যতম মাধ্যম এই উৎসব। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে রাজপরিবারের সঙ্গে স্থানীয় মানুষের যে সম্পর্ক তৈরি হয়েছে, দুর্গাপুজো সেই বন্ধনকে আরও দৃঢ় করে।















