১৯০৫ সালের ৭ অগাস্ট। কলকাতার টাউন হলে গর্জে উঠেছিল পরাধীন ভারতের স্বদেশি আন্দোলন। বিলিতি পণ্য বর্জন করে নিজেদের হাতে বোনা কাপড় ও দেশীয় শিল্পকে আঁকড়ে ধরার সেই ঐতিহাসিক অঙ্গীকারই ছিল ভারতের আত্মনির্ভরতার প্রথম পাঠ। দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখতে ২০১৫ সাল থেকে প্রতিবছর এই দিনটি ‘জাতীয় হস্তচালিত তাঁত দিবস’ (National Handloom Day) হিসেবে পালিত হয়।
লুকানো সুতোয় জীবনের বুনন
মেঠোঘরে তাঁতকলের চেনা খটখট শব্দ, আর সুতোর রঙিন খেলা। সেই ঐতিহ্যবাহী বয়নশিল্প আর লোকশিল্পের আসল প্রাণশক্তি হল গ্রামীণ নারীদের নিপুণ আঙুল— যাঁরা প্রতিকূলতার মুখে দাঁড়িয়েও প্রতিদিন কাপড়ের জমিনে বুনে চলেন নিজেদের জীবনসংগ্রামের গল্প। গতকাল ছিল ‘বিশ্ব হস্তচালিত তাঁত দিবস’। লিখলেন পিয়ালি মুখোপাধ্যায়
Sponsored

এই বিষয়ে গুরুত্ব দিয়ে ২০২৪ সালের জাতীয় তাঁত দিবসের মূল বিষয় হয়ে উঠেছিল ‘টেকসই ভবিষ্যৎ বুনন’ আর ২০২৫ সালের মূল প্রতিপাদ্য বিষয় ছিল ‘ঐতিহ্যের মাঝে নতুনত্বের বুনন’। এছাড়াও মহিলা তাঁতিদের অবদানের প্রতি সম্মান জানাতে মূল লক্ষ্য ছিল নারী ক্ষমতায়ন।
ইতিহাসের পাতায় তাঁতশিল্পের সূচনা কেবল স্বাধীনতার আন্দোলনের প্রতীক ছিল না একটা সময় তা রূপ নিয়েছিল বাংলার গাঁয়ের হাজারো সাধারণ নারীর অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে। হ্যান্ডলুমের প্রসঙ্গ এলেই হয়তো ভেসে ওঠে মেঠো ঘরের তাঁতকলের সেই চেনা খটখট শব্দ, আর সুতোর রঙিন খেলা। কিন্তু এই ঐতিহ্যবাহী বয়নশিল্প আর লোকশিল্পের আসল প্রাণশক্তি লুকিয়ে রয়েছে আমাদের গ্রামীণ নারীদের নিপুণ আঙুলে— যাঁরা প্রতিকূলতার মুখে দাঁড়িয়েও প্রতিদিন কাপড়ের জমিনে বুনে চলেন নিজেদের জীবনসংগ্রামের গল্প।
পশ্চিমবঙ্গের মানচিত্র ধরে আরও দক্ষিণে নামলে যেখানে নোনা জলের গন্ধ আর বাঘের ভয়, সেই সুন্দরবনের দুর্গম রাঙাবেলিয়া দ্বীপে গেলে শোনা যায় আরেক সংগ্রামের গল্প। প্রতি বছর আগস্ট মাসে সারা দেশ জুড়ে ‘জাতীয় তাঁত দিবস’ পালিত হয় তখন রাঙাবেলিয়ার নারীদের তাঁত সংগ্রাম এক ভিন্ন মাত্রা পায়।
ঝড়, বন্যা, আয়লা কিংবা আমফানের নোনা জলে ঘরবাড়ি ভেসে যাওয়া এখানকার নিত্যসঙ্গী। পুরুষেরা যখন কাজের খোঁজে দেশান্তরী হন বা নদীতে মাছ-কাঁকড়া ধরতে গিয়ে বিপদের মুখে পড়েন, তখন রাঙাবেলিয়ার নারীরা শক্ত হাতে সামলান সংসারের হাল। ‘রাঙাবেলিয়া মহিলা সমিতি’ ও স্থানীয় স্বনির্ভর গোষ্ঠীর ছায়ায় বসে তাঁরা বুনতে শুরু করেন তাঁতের কাপড় আর কাঁথা স্টিচ।
সূতো রঙ করা থেকে শুরু করে খটখট শব্দে হস্তচালিত তাঁত চালানো— সবই করেন তাঁরা। আর সেই কাপড়ের ক্যানভাসে বুনে দেন নিজেদের চারপাশের প্রকৃতিকে— ম্যানগ্রোভ অরণ্য, জলজ পাখি আর নদীর বাঁক। তাঁদের বোনা প্রতিটি বস্ত্র কেবল পরিধান নয়, তা জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে থাকা এক অদম্য জীবনসংগ্রামের প্রতীক।
দুপুরের চড়া রোদটা যখন আলসে হয়ে তালগাছের মাথায় হেলে পড়ে, ঠিক তখন বাংলার কোনও এক মেঠো গাঁয়ের নীরবতা ভাঙতে শুরু করে। ঘরের খাঁ-খাঁ দাওয়ায় কিংবা বটতলার একফালি স্নিগ্ধ ছায়ায় একে একে এসে বসেন কয়েকজন নারী। কোলজুড়ে মেলে ধরা পুরনো শাড়ির নরম জমিন, আর হাতে ধরা একখানা ছোট্ট সূচ। লাল, নীল, হলুদ সুতোর ছন্দময় ফোঁড়ে ফোঁড়ে সেই কাপড়ের বুকে ফুটতে শুরু করে রূপকথার ময়ূর, নদী, লতাপাতা আর মানুষের সুখ-দুঃখের গল্প।
দূর থেকে দেখলে মনে হতে পারে, এ কেবলই অলস দুপুর কাটানোর সাধারণ কোনও ঘরকন্না। অথচ এই অদৃশ্য হাতগুলোর কারসাজিতেই কিন্তু শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে নীরবে রচিত হয়ে চলেছে এক বিরাট সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক বিপ্লব।
বাংলার লোকশিল্প ও হস্তশিল্পের ইতিহাস বহু পুরনো, আর এর নিঃশব্দ কান্ডারি হলেন গ্রামীণ নারীরা। এই শিল্পকলা শেখার জন্য তাঁদের কোনও বড় বিদ্যাপীঠে যেতে হয়নি। প্রথাগত পুঁথিগত শিক্ষার বাইরে গিয়ে, অলিখিত নিয়মে মা-দিদিমাদের কাছ থেকে এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে হস্তান্তরিত হয়েছে এই বিদ্যা।
নকশি কাঁথা ও সূচিশিল্প : ছেঁড়া শাড়ি আর ফেলে দেওয়া কাপড়ের সুতো দিয়ে শুধুই শরীর ঢাকার কাঁথা তৈরি হয় না; প্রতিটি ফোঁড়ে জমা হয়ে থাকে একেকটি নারীর অব্যক্ত যন্ত্রণা, নীরব স্বপ্ন ও ভালোবাসা।
মৃৎশিল্প ও আলপনা : লক্ষ্মীপুজোর উঠোনে আঁকা চালচিত্র কিংবা মাটির হাঁড়িকুড়ি ও পুতুলে তুলির আঁচড় দেওয়ার কাজটি আজও নারীদের আঙুলের ছোঁয়াতেই প্রাণ পায়।
বাঁশ, বেত ও পাটের কারুকাজ : গৃহস্থালির বাহারি শিকা, বাঁশ-বেতের নিপুণ ঝুড়ি বা পাখা তৈরি—সবকিছুতেই তাঁদের সহজাত নন্দনবোধ স্পষ্ট।
এই শিল্প আসলে ফেলে দেওয়া জিনিসকে নতুনের রূপ দেওয়ার এক অদ্ভুত পরিবেশবান্ধব ‘আপসাইক্লিং’ বিদ্যা। কোনও অপচয় না করে প্রকৃতিকে ভালোবেসে বাঁচিয়ে রাখার এই শিক্ষা গ্রামীণ নারীর রক্তে মিশে আছে।
গ্রামীণ নারীর এই নীরব লড়াই আর লোকশিল্প কীভাবে জীবন বদলে দিতে পারে, তার এক অনন্য উদাহরণ বীরভূমের সিউড়ির তৃপ্তি মুখোপাধ্যায়। মাত্র ৬ বছর বয়সে মায়ের পাশে বসে কাপড়ে সুতো গলানোর হাতেখড়ি হয়েছিল তাঁর। সংসারে চরম অভাব-অনটন, কিন্তু মনের ভেতরের শিল্পীকে তিনি মরতে দেননি। সুচ-সুতোর বুননই হয়ে উঠেছিল তাঁর অস্তিত্ব রক্ষার প্রধান হাতিয়ার।
নিজের ভাগ্যের চাকা ঘুরিয়েই কিন্তু তৃপ্তি দেবী ক্ষান্ত হননি। তিনি হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন গ্রামের হাজারো গৃহবন্দি নারীর দিকে। প্রতিষ্ঠা করলেন একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। দেখতে দেখতে প্রায় ২০ হাজারেরও বেশি প্রান্তিক নারীকে কাঁথা স্টিচের কাজে দক্ষ করে অর্থনৈতিক স্বাধীনতার মুখ দেখালেন তিনি। মেঠো পথের সেই সাধারণ মেয়েটির অসামান্য কারুকাজ ও সমাজ বদলের এই লড়াই স্বীকৃতি পেল আন্তর্জাতিক মঞ্চে— তিনি ভূষিত হলেন ‘পদ্মশ্রী’ সম্মানে। তৃপ্তি দেবীদের গল্প তাই শুধু এক শিল্পীর গল্প নয়, এ হল গ্রামের প্রতিটি নারীর আত্মবিশ্বাসের জয়গান।
গৃহকোণ থেকে অর্থনীতির মূলস্রোতে
আজ আর হস্তশিল্প কেবল ঘরের সাজসজ্জায় আটকে নেই। কৃষিনির্ভর পরিবারগুলোতে যখন অনাবৃষ্টি বা ঋতুভিত্তিক বেকারত্ব হানা দেয়, তখন এই নারীদের শিল্পকর্মই হয়ে ওঠে সংসারের প্রধান ভরসা। হস্তশিল্প বিক্রি করে উপার্জন করা দুটো টাকা তাঁদের সমাজে কথা বলার জোর এনে দিয়েছে।
স্বনির্ভর গোষ্ঠীর কল্যাণে শহরের মেলা থেকে শুরু করে ডিজিটাল বাজারে আজ ছড়িয়ে পড়ছে তাঁদের তৈরি কাজ। এই অর্জিত অর্থে নারীরা সন্তানদের স্কুলে পাঠাচ্ছেন, পরিবারের খাদ্যের সংস্থান করছেন এবং নিজেদের একটি স্বাধীন পরিচয় গড়ে তুলছেন।
Sponsored

প্রান্তের লড়াই ও আগামীর আলো
অবশ্য এই পথ এখনও সম্পূর্ণ মসৃণ নয়। ঘণ্টার পর ঘণ্টা সূক্ষ্ম কাজ করার পরেও মধ্যস্বত্বভোগীদের চক্রান্তে অনেক সময় ন্যায্য মজুরি মেলে না। কাঁচামালের চড়া দাম এবং আধুনিক পাওয়ারলুমের সস্তা কাপড়ের দাপটে হস্তশিল্পীদের টিকিয়ে রাখার লড়াইটা বড্ড কঠিন।
Sponsored

তবুও হার মানেননি বাংলার মহিলা শিল্পীরা। মাটির সুবাস আর বুননের ভালোবাসাকে পুঁজি করে তাঁরা এগিয়ে চলেন। কারণ যেখানে মুখ ফুটে কথা বলা যায় না, সেখানে সুচ-সুতোর ফোঁড় আর মাটির গড়ন কথা বলে ওঠে। লোকশিল্পে গ্রামীণ নারীর এই অবদানকে স্বীকৃতি দেওয়া এবং সঠিক বাজার তৈরি করে দেওয়া আমাদের সবার দায়িত্ব। কারণ তাঁদের হাতের বোনা এই রঙিন সুতোতেই বাঁধা রয়েছে আমাদের আবহমান বাংলার সংস্কৃতির ভবিষ্যৎ।
Sponsored

Sponsored













