আগে বিজেপির দিল্লির নেতারা বাংলায় এসে বলতেন, "মমতা দিদি, রাজ্যে দুর্গাপুজো করতে দেন না।" রাজনৈতিক পালাবদলের পর এখন রাজ্যে ক্ষমতায় সেই বিজেপি। আর অভিযোগ, খাস কলকাতার বুকে শাসকদলের চাপে ৬৩ বছরের দুর্গাপুজো বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিল '২০'র পল্লী সার্বজনীন দুর্গোৎসব কমিটি'! ২৯ জুলাই খুঁটিপুজো হয়ে যাওয়া সত্ত্বেও ১৫ অগাস্ট, স্বাধীনতা দিবসে রীতিমতো ব্যানার টাঙিয়ে এবং সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট দিয়ে দুর্গোৎসব কমিটি জানিয়ে দিল, 'পারিপার্শ্বিক চাপের ফলে' এ বছর আর পুজো করতে চায় না তারা। পুজো কমিটির পক্ষ থেকে গৌতম রায় 'বিশ্ব বাংলা সংবাদ'-কে জানান, স্থানীয় বিজেপির নেতাদের চাপেই এই সিদ্ধান্ত নিতে হল তাঁদের। শুধু তাই নয়, এবার কাদের হাতে এই পুজোর দায়িত্ব স্থানীয় বিজেপি বিধায়ক তথা রাজ্যের প্রতিমন্ত্রী পূর্ণিমা চক্রবর্তী দেন- তা নিয়ম শঙ্কিত স্থানীয়রা।

স্বাধীনতা দিবসের সকালেই সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি পোস্ট ঘিরে শোরগোল পড়ে গিয়েছিল। পোস্টটি '২০'র পল্লী সার্বজনীন দুর্গোৎসব কমিটি'-র পেজে করা হয়। তাড়াতাড়ি রীতিমতো পোস্টার দিয়ে লেখা রয়েছে,

"স্বাধীন ভারতে আজ আমরা পরাধীন। ৬৩ বছর ধরে চলা দুর্গাপুজো এই মুহূর্তে কিছু ব্যক্তি এবং বর্তমান পারিপার্শ্বিক চাপের কারণে নানান হুমকি নানান শারীরিকভাবে নির্যাতনের হুমকি এর বিরুদ্ধে আমাদের এই প্রতিবাদ পুজো না করার সিদ্ধান্ত"। 

বিষয়টি নিয়ে 'বিশ্ববাংলা সংবাদ'-এর পক্ষ থেকে পুজো কমিটির সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা একের পর এক বিস্ফোরক অভিযোগ করে। তাদের পক্ষ থেকে গৌতম রায় দাবি করেন, "২৯ জুলাই খুঁটিপুজোর আগে তাঁরা স্থানীয় বিধায়ক পূর্ণিমা চক্রবর্তী সঙ্গে দেখা করেছিলেন। পুজো করার সম্মতি জানিয়ে বিধায়ক তথা প্রতিমন্ত্রী শর্ত দিয়েছিলেন, তাঁর মনোনীত দুই বিশিষ্ট ব্যক্তিকে পুজো কমিটিতে রাখতে হবে।" সেই শর্ত মেনে নেয় পুজো কমিটি। কিন্তু সমস্যা শুরু হয় খুঁটিপুজোর দিন থেকেই। অভিযোগ, সেদিন বাইক বাহিনী এসে রীতিমতো অশ্রাব্য ভাষায় কর্মকর্তাদের হুমকি দিয়ে যান। গৌতমের অভিযোগ, সোমনাথ সেন, বাপি গোস্বামী-সহ বিজেপির স্থানীয় মণ্ডলের দায়িত্বে থাকা নেতারা ফতোয়া দেন, পুজো কমিটিতে তৃণমূলের যেসব সক্রিয় নেতা-কর্মী রয়েছেন তাঁদের কমিটি থেকে বের করে দিতে হবে, না হলে এই পুজো তাঁরা করতে দেবেন না।

গৌতম জানান, ৬৩ বছরের পুরনো পুজোয় কমিটিতে রাজনৈতিক রঙ দেখা হয় না। সেখানে তৃণমূল, সিপিএম, কংগ্রেসও যেমন আছেন, সেখানে আরএসএস-এর সদস্যরাও আছেন। তাঁদের একটাই পরিচয়- তাঁরা পল্লিবাসী। সবাই মিলে একসঙ্গে ঘরোয়া ভাবে দুর্গাপুজো করেন। এমনকী অধুনালুপ্ত জোড়াবাগান বিধানসভার সিপিএম বিধায়ক সুধাংশু শীলের আমলেও তাদের দুর্গাপুজো করতে কোন বাধা সম্মুখীন হতে হয়নি বলে জানান গৌতম রায়। কিন্তু এখন বারবার বহিরাগতরা এলাকায় এসে হুমকি দিচ্ছেন অভিযোগ। 

কিন্তু হঠাৎ এমন পরিস্থিতি হল কেন?

গৌতমের অভিযোগ, বিধানসভা নির্বাচনের আগে বিজেপি নেতা মিঠুন চক্রবর্তী তাঁদের পাশের পাড়া জোড়াবাগানে সভা করতে এসেছিলেন। তখন কেউ বা কারা তাঁর ছবিকে 'অপমান' করে। মিঠুন চক্রবর্তীর স্থানীয় সহযোগীর অভিযোগ, যাঁরা ওই ঘটনায় জড়িত তাঁরা এই পুজো কমিটির সদস্য। সুতরাং তাঁদের রাখা হলে এই পুজো করা যাবে না। যেহেতু জোড়া বাগান এলাকায় মিঠুন চক্রবর্তীর প্রভাব বিজেপির উপর যথেষ্ট, সে কারণেই এই বাধা বলে অনুমান পুজো কমিটির সদস্যদের। তাঁরা কোনওরকম ঝামেলা চাইছেন না। তাঁরা শান্তিতে বসবাস করতে চাইছেন। সেই কারণে যে কেউ এই পুজোর দায়িত্ব নিতে পারেন। এই মর্মে ইতিমধ্যেই স্থানীয় বিধায়িকাকে আবেদনপত্রও জমা দিয়েছেন গৌতমরা।

তবে একই সঙ্গে স্থানীয়দের আশঙ্কা, বহিরাগত, ভিন্ন ভাষাভাষীরা যদি এই পুজোর দখল নেন, তাহলে তাঁদের পাড়ার শান্তিশৃঙ্খলা বিঘ্নিত হতে পারে।