রাজনীতিতে বিরোধিতা নতুন কিছু নয়। মুখ্যমন্ত্রীকে আক্রমণ, সরকারের সমালোচনা, নীতির বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ সবই গণতান্ত্রিক রাজনীতির পরিচিত ছবি। কিন্তু সেই বিরোধিতার ভাষা যখন সরাসরি একজন মুখ্যমন্ত্রীর মৃত্যুকামনায় পৌঁছে যায়, তখন তা নিছক রাজনৈতিক আক্রমণ থাকে না। প্রশ্ন ওঠে রাজনৈতিক শালীনতা ও দায়িত্ববোধ নিয়েই। আর সেই বিতর্কের কেন্দ্রে এবার আমজনতা উন্নয়ন পার্টির প্রতিষ্ঠাতা হুমায়ুন কবীর (Humayun Kabir, founder of the Aam Janata Unnayan Party)। প্রকাশ্য সাংবাদিক বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীকে (Chief Minister Suvendu Adhikari) উদ্দেশ্য করে তাঁর ‘দ্রুত পৃথিবী থেকে বিদায়’ এর প্রার্থনার মন্তব্য ঘিরে ইতিমধ্যেই তীব্র রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

আরও পড়ুন: ধান জমিতে তিন হাতির নিথর দেহ, চাঞ্চল্য হাড়তড়ায়

হুমায়ুনের বক্তব্যের মূল সুর ছিল মুখ্যমন্ত্রীর বিরুদ্ধে তীব্র রাজনৈতিক ক্ষোভ। কিন্তু সেই ক্ষোভ প্রকাশ করতে গিয়ে যে ভাষা তিনি বেছে নিয়েছেন, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয়। প্রকাশ্য মঞ্চে একজন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি একজন মুখ্যমন্ত্রীর মৃত্যু কামনা করছেন এই দৃশ্য স্বাভাবিকভাবেই রাজনৈতিক মহলে প্রশ্ন তুলেছে। তবে শুধু ‘মৃত্যুকামনা’তেই থামেননি হুমায়ুন। তাঁর বক্তব্যে এসেছে ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনার প্রসঙ্গ, ক্ষমতার অহংকারের পতনের কথা এবং পৃথিবী থেকে মুখ্যমন্ত্রীর বিদায় নেওয়ার ইঙ্গিত। 

হুমায়ুন বলেন, ক্ষমতায় আসার পর মুখ্যমন্ত্রী বদলে গিয়েছেন এবং তাঁর শাসনকালে সংখ্যালঘুদের উপর অত্যাচার চলছে। এই অভিযোগের ভিত্তিতেই তিনি মুখ্যমন্ত্রীর বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন। তবে সরকারের নীতি বা প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করার রাজনৈতিক অধিকার এবং কোনও ব্যক্তির মৃত্যুকামনা করা এই দুই বিষয় এক নয়।

হুমায়ুন কবীরের রাজনৈতিক বক্তব্য নিয়ে বিতর্ক অবশ্য নতুন নয়। এর আগেও মুখ্যমন্ত্রীকে নিজের নির্বাচনী এলাকা রেজিনগর বা নওদায় প্রবেশ করা নিয়ে হুঁশিয়ারি দেওয়া থেকে শুরু করে প্রশাসন ও পুলিশকে ঘিরে তাঁর একাধিক মন্তব্য রাজনৈতিক মহলে আলোড়ন তৈরি করেছিল। সেই সময়ও তাঁর বক্তব্যের ভাষা নিয়ে বিস্তর চর্চা হয়েছিল।

আরও বিতর্ক তৈরি হয়েছে তাঁর বক্তব্যে দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের কয়েকটি মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের প্রসঙ্গ টেনে আনার কারণে। ইন্দিরা গান্ধী, রাজীব গান্ধী, মাধবরাও সিন্ধিয়া এবং অজিত পওয়ারের মতো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তিনি নিজের বক্তব্যকে যে প্রেক্ষাপটে রেখেছেন, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে রাজনৈতিক ভাষার সীমা এবং দায়িত্বশীলতা নিয়ে।

আরও পড়ুন: চার বছরের বিশ্বাসে চিড়! পরিচারিকার বিরুদ্ধে কোটি টাকা ও গয়না আত্মসাতের অভিযোগ

তিনি বলেন, ‘‘ক্ষমতা পেয়ে হাতির পাঁচ পা দেখেছে! উপরওয়ালার কাছে দোয়া চাইব, যত তাড়াতাড়ি পৃথিবী থেকে চলে যায়। আল্লা তার টিকিট কাটিয়ে দিক। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যেদিন নিজের দল থেকে আমাকে বহিষ্কার করেছিলেন, সেদিনও দোয়া চেয়েছিলাম, উনি যেন ক্ষমতাচ্যুত হন, বর্তমান থেকে প্রাক্তন হন। আল্লা সেকথা শুনেছেন। মহারাষ্ট্রের অজিত পওয়ার, মাধবরাও সিন্ধিয়া কিংবা ইন্দিরা গান্ধী, রাজীব গান্ধীদের যেমন হয়েছিল, একেও সেভাবে পৃথিবী থেকে যেতে হবে। আস্ফালন, অহংকারের পতন হবে।”

সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ থাকতেই পারে। মুখ্যমন্ত্রীর নীতির বিরোধিতা করাও গণতন্ত্রের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। কিন্তু সেই বিরোধিতা কোন ভাষায় প্রকাশ করা হচ্ছে, সেটিও গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।