উত্তম কুমার শুধু একটি নাম নয়, বাঙালির আবেগ, স্মৃতি এবং সংস্কৃতির সঙ্গে মিশে থাকা এক অধ্যায়। শতবর্ষ পরেও বাঙালির কাছে তাঁর জনপ্রিয়তায় এতটুকু ভাটা পড়েনি। মহানায়কের জন্মশতবর্ষকে কেন্দ্র করে সেই পুরনো দিনের উত্তম-স্মৃতিকে এক ছাদের নীচে হাজির করল বিশেষ প্রদর্শনী ‘উত্তম—দ্য মহানায়ক’।
ফিরে দেখা, ICCR-এ 'উত্তম—দ্য মহানায়ক'
Sponsored

২০ অগাস্ট থেকে ২৪ অগাস্ট পর্যন্ত কলকাতার আইসিসিআরের যামিনী রায় গ্যালারিতে আয়োজিত হয়েছে এই বিশেষ প্রদর্শনী। দুপুর ৩টে থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত দর্শকদের জন্য খোলা থাকবে প্রদর্শনীটি। প্রথম দিন অবশ্য সময়সূচিতে কিছুটা পরিবর্তন ছিল। শ্যাম সুন্দর কোং জুয়েলার্সের নিবেদনে, খুকুমণি ও দেব চক্রবর্তীর সহযোগিতায় এবং থিজম ইভেন্টসের আয়োজনে এই প্রদর্শনীতে উঠে এসেছে উত্তম কুমারের অভিনয়জীবনের পাশাপাশি তাঁর সময়ের চলচ্চিত্র সংস্কৃতির এক মূল্যবান দলিল।
আরও পড়ুন: ছররা-কাণ্ডে FIR দায়েরের দাবিতে ধর্নায় রাহুল-প্রিয়াঙ্কা
প্রদর্শনীর মূল আকর্ষণ বিশিষ্ট চলচ্চিত্র পোস্টার সংগ্রাহক সুদীপ্ত চন্দের সংগ্রহ। তাঁর সংগ্রহে থাকা উত্তম কুমারের ছবির দুর্লভ পোস্টার, বুকলেট, সং বুক, ফিল্ম স্টিল, লবি কার্ড, ছবির বিজ্ঞাপন, পুরনো পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদন ও ছবি, গানের বই, রেকর্ড-সহ নানা প্রচারসামগ্রী এই প্রদর্শনীতে জায়গা পেয়েছে। অনুষ্ঠানের উদ্বোধনী পর্বে উপস্থিত ছিলেন শ্যাম সুন্দর কোং জুয়েলার্সের কর্ণধার রূপক সাহা, থিজম ইভেন্টসের কর্ণধার পার্থ সাহা, উত্তম কুমারের পুত্রবধূ মহুয়া চট্টোপাধ্যায়, অভিনেত্রী দেবশ্রী রায়, সঙ্গীতশিল্পী অন্তরা চৌধুরী, সৈকত মিত্র, সঙ্গীত পরিচালক দেবজ্যোতি মিশ্র এবং বাংলা ব্যান্ড ‘পৃথিবী’র কৌশিক চক্রবর্তী-সহ বিশিষ্টজনেরা।
আরও পড়ুন: রাজধানীতে দ্রুত বাড়ছে সোয়াইন ফ্লু আতঙ্ক! আক্রান্ত হাজারের বেশি
সুদীপ্ত চন্দের সংগ্রহে রয়েছে উত্তম কুমার প্রযোজিত হিন্দি ছবি ‘ছোটি সি মুলাকাত’-এর দু’টি আলাদা মাপ ও নকশার পোস্টার। রয়েছে ‘অমানুষ’-এর হিন্দি মুম্বই প্রিন্টের বড় পোস্টার, ‘দূরিয়া’-র দু’টি ভিন্ন নকশার পোস্টার এবং ‘বন্দী’ ও ‘বহ্নিশিখা’-র দুই শিটের বড় পোস্টার। দুর্লভ পোস্টারের তালিকায় রয়েছে ‘যাত্রা হলো শুরু’, ‘পুনর্মিলন’, ‘পুত্রবধূ’, ‘প্রিয় বান্ধবী’-সহ একাধিক ছবির পোস্টার। এমনকী ওড়িয়া হরফে ছাপা ‘বন্দী’-র পোস্টারও রয়েছে এই সংগ্রহে। ‘ব্রতচারিণী’, ‘ওরা থাকে ওধারে’, ‘চন্দ্রনাথ’, ‘ত্রিযামা’, ‘অন্নপূর্ণার মন্দির’-সহ শতাধিক ছবির পোস্টার প্রদর্শিত হয়েছে।
শুধু পোস্টারেই থেমে নেই সংগ্রহ। প্রায় একশোর কাছাকাছি দুর্লভ বুকলেটের মধ্যে রয়েছে ‘মন্ত্রশক্তি’, ‘সঞ্জীবনী’, ‘হ্রদ’, ‘বকুল’, ‘শঙ্কর নারায়ণ ব্যাঙ্ক’, ‘দেবত্র’, ‘বসু পরিবার’, ‘নবীন যাত্রা’-র মতো ছবির প্রচারপুস্তিকা। রয়েছে উত্তম কুমারের নিজের গাওয়া গানের রেকর্ড, তাঁর অভিনীত বিভিন্ন ছবির রেকর্ড এবং গানের বই। পাশাপাশি ‘নিশান’ ছবির লেটারহেড, পুরনো পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত ছবির বিজ্ঞাপন, উত্তমের গান নিয়ে প্রকাশিত লেখা, সুচিত্রা সেনকে নিয়ে প্রতিবেদন, বিভিন্ন অনুষ্ঠানের দুর্লভ ছবি, ফিল্ম স্টিল, লবি কার্ড এবং অপ্রকাশিত ছবির বিজ্ঞাপনও দেখা যাচ্ছে প্রদর্শনীতে।
এই বছরই চলচ্চিত্র সংগ্রাহক হিসেবে সুদীপ্ত চন্দের পথচলার ২০ বছর পূর্ণ হয়েছে। ভবানীপুর মিত্র ইনস্টিটিউশনের ছাত্র থাকাকালীনই চলচ্চিত্রের পোস্টারের প্রতি তাঁর আগ্রহ তৈরি হয়। পরে নিজের স্কুলে সরস্বতী পুজো উপলক্ষে আয়োজন করেন চলচ্চিত্র পোস্টারের প্রদর্শনী। সময়ের সঙ্গে সেই আগ্রহই পরিণত হয় দীর্ঘ দুই দশকের সংগ্রহ ও সংরক্ষণের নেশায়। গত দুই দশকে উত্তম কুমার থেকে সুচিত্রা সেন, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, কিশোর কুমার, রাহুল দেব বর্মন, অমিতাভ বচ্চন থেকে বাংলার একাধিক প্রবাদপ্রতিম সুরকার—বিভিন্ন বিষয়কে কেন্দ্র করে প্রদর্শনীর আয়োজন করেছেন সুদীপ্ত। কলকাতার পাশাপাশি ত্রিপুরাতেও তাঁর চলচ্চিত্র পোস্টারের প্রদর্শনী প্রশংসা পেয়েছে। তাঁর সংগ্রাহকজীবনের কাজের স্বীকৃতি এসেছে বিভিন্ন মহল থেকেও।
সুদীপ্ত চন্দ বাণিজ্য বিভাগে স্নাতক হন হেরম্বচন্দ্র কলেজ থেকে। পরে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জনসংযোগ বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। রবীন্দ্রসঙ্গীতে সুরঙ্গমা থেকে ডিপ্লোমাও রয়েছে তাঁর। দীর্ঘদিন সঙ্গীত বিষয়ক সাংবাদিকতার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন তিনি। ‘দ্য স্টেটসম্যান’-সহ বিভিন্ন পত্রিকায় তাঁর সঙ্গীত বিষয়ক লেখা প্রকাশিত হয়েছে। তৈরি করেছেন অমিত কুমার ফ্যান ক্লাব এবং নিজের মিউজিক পিআর এজেন্সি ‘দ্য ড্রিমার্স’। তাঁর সংস্থার উদ্যোগে আয়োজিত হয়েছে ‘মাউন্টেন মিউজিক ফেস্টিভ্যাল’। ‘সন্দেশ’, ‘উল্টোরথ’-সহ বিভিন্ন পত্রিকাতেও তাঁর লেখা প্রকাশিত হয়েছে। কাজের স্বীকৃতি হিসেবে সম্মান পেয়েছেন পাবলিক রিলেশন সোসাইটি অব ইন্ডিয়া এবং টেডেক্স-এর মতো মঞ্চে।
প্রদর্শনী প্রসঙ্গে সুদীপ্ত চন্দ বলেন, “দীর্ঘ দু’দশক ধরে একটা ভালোবাসাকে সযত্নে লালন-পালন করে আসছি। মূলত ছবির পোস্টার সংগ্রাহক হিসেবেই আমার পরিচিতি। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যাঁরা চলচ্চিত্র নিয়ে পড়াশোনা করেন বা আগ্রহী, তাঁরা এই সংগ্রহ দেখলে একটা সময় সম্পর্কে ধারণা করতে পারবেন। সংগ্রহের পাশাপাশি সংরক্ষণ ও প্রচারের মাধ্যমে মানুষ ইতিহাস সম্পর্কে আরও সচেতন হন। এই ধরনের প্রদর্শনী নতুন প্রজন্মকে আমাদের গৌরবময় অতীত সম্পর্কে জানতে সাহায্য করে।”
Sponsored

Sponsored

Sponsored

Sponsored













