এসআইআর-কে (SIR) ঘিরে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক চলছে দেশজুড়ে। দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের (Gyanesh Kumar) বিরুদ্ধে সরব হয়েছে গোটা দেশ। সেই আবহেই ভোটার তালিকা সংশোধনের কাজে ব্যবহৃত ‘ইসিআইনেট’ সফটওয়্যারে একাধিক পরিবর্তনের দাবি উঠল কমিশনের অন্দরেই। চারটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সফটওয়্যারটি বদলের আর্জি জানিয়ে নির্বাচন কমিশনকে চিঠি দিয়েছেন মহারাষ্ট্রের (Maharashtra) মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক (CEO) এস চোক্কালিঙ্গম (S Chockalingam)।
আরও পড়ুন: শেয়ারবাজারের লিস্টিং রুখতে টাটা ট্রাস্টসের মাস্টারস্ট্রোক! নোয়েলের চালে কি ঘুরবে খেলা
মূলত ভোটার তালিকায় ‘লজিক্যাল ডিসক্রেপেন্সি’ দেখা দিলে কীভাবে তার নিষ্পত্তি হবে, সেই প্রক্রিয়াতেই পরিবর্তন চেয়েছেন তিনি। তাঁর প্রস্তাব অনুযায়ী, শুনানি এবং নথি যাচাইয়ের পরে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে ইলেক্টোরাল রেজিস্ট্রেশন অফিসারদের (ইআরও) আরও বেশি ক্ষমতা থাকা প্রয়োজন।
আরও পড়ুন: নিয়োগ দুর্নীতি মামলায় SIT ভাঙার আর্জি খারিজ হাই কোর্টে
বর্তমানে ইসিআইনেট সফটওয়্যারে ইআরও-দের জন্য নির্দিষ্ট কিছু বিকল্প রাখা রয়েছে। কোনও ভোটারকে নথি যাচাইয়ের জন্য ডাকা হলে, শুনানি শেষে সেই নথির ভিত্তিতে কী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে, তা সফটওয়্যারই ঠিক করে। কিন্তু মহারাষ্ট্রের সিইও-র বক্তব্য, সব পরিস্থিতির জন্য এই ব্যবস্থা যথেষ্ট নয়। বিশেষ করে যে ভোটাররা প্রয়োজনীয় নথি দেখাতে সক্ষম হয়েছেন, কিন্তু বয়স, অসুস্থতা কিংবা অন্য কোনও সমস্যার কারণে শুনানিতে উপস্থিত হতে পারছেন না। এই পরিস্থিতিতে তাঁদের জন্য আলাদা কোনও ব্যবস্থা নেই। তাই ইসিআইনেটে তৃতীয় একটি বিকল্প রাখার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনীয় নথি থাকলে প্রত্যেক ভোটারকে ব্যক্তিগত ভাবে শুনানিতে হাজির করানোর বাধ্যবাধকতা না রাখার প্রস্তাব দিয়েছেন তিনি।
এসআইআর চলাকালীন পুরনো ভোটার তালিকার তথ্যের সঙ্গে বর্তমান ভোটারের বয়স বা বাবা-মায়ের নামের মতো তথ্যের মিল না থাকলেও ‘তথ্যগত অসঙ্গতি’ দেখিয়ে নোটিস পাঠানো হচ্ছে। এরপর সংশ্লিষ্ট ভোটারকে নির্দিষ্ট নথি দিয়ে নিজের নামের পক্ষে দাবি জানাতে হচ্ছে। এখানেও ইআরও-দের ভূমিকা আরও স্পষ্ট এবং কার্যকর করার কথা বলা হয়েছে চিঠিতে।
নথির ক্ষেত্রেও একটি বড় পরিবর্তনের প্রস্তাব এসেছে। কমিশন ইতিমধ্যেই ১৩ ধরনের নথির তালিকা প্রকাশ করেছে। কিন্তু মহারাষ্ট্রের সিইও মনে করছেন, পরিস্থিতি অনুযায়ী আরও কিছু প্রাসঙ্গিক নথি গ্রহণের সুযোগ থাকা উচিত। তাঁর যুক্তি, সমাজের এমন কিছু মানুষ রয়েছেন, যেমন গৃহহীন, ভবঘুরে বা যৌনকর্মী। তাঁদের পক্ষে কমিশনের নির্ধারিত ১৩টি নথির কোনওটি জোগাড় করা কঠিন হতে পারে। তাই শুধু নির্দিষ্ট তালিকায় থাকা নথির মধ্যেই যাচাই প্রক্রিয়াকে আটকে না রেখে প্রয়োজন অনুযায়ী অন্য গ্রহণযোগ্য নথি বিবেচনার সুযোগ রাখার আবেদন জানানো হয়েছে।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের দাবি করা হয়েছে। কোনও ভোটারের ‘তথ্যগত অসঙ্গতি’ শুধুমাত্র বুথ স্তরের আধিকারিকের বক্তব্যের ভিত্তিতে নিষ্পত্তি করা সম্ভব না হলে বর্তমানে বিষয়টি জেলা নির্বাচনী আধিকারিকের কাছে পাঠানোর ব্যবস্থা রয়েছে। মহারাষ্ট্রের সিইও-র প্রস্তাব, ভোটার যথাযথ নথি জমা দিলে এবং সেই নথি সন্তোষজনক হলে ইআরও-ই যেন চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। প্রয়োজনে সেই সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে ভোটার তালিকায় নাম রাখা বা বাদ দেওয়ার ক্ষমতাও তাঁদের হাতে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
এই চিঠি শুধু মহারাষ্ট্রের সিইও-র তরফ থেকেই নয়। ডেপুটি নির্বাচন কমিশনার মণীশ গর্গ এবং সচিব পর্যায়ের দুই আধিকারিকও কমিশনের আইটি বিভাগের ডিরেক্টর জেনারেল সীমা খান্নাকে চিঠি দিয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ইসিআইনেটের কার্যপদ্ধতি এবং ইআরও-দের ভূমিকা নিয়ে কমিশনের ভিতরে এর আগেও প্রশ্ন উঠেছিল।
ঘটনাপ্রবাহটি আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে ২৩ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত ‘ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এর একটি তদন্তমূলক প্রতিবেদনের পর। ওই প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছিল, নির্বাচন কমিশনের দুই কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু এবং বিবেক জোশী অভিযোগ তুলেছেন, তাঁদের অন্ধকারে রেখে কমিশনের বেশ কিছু সিদ্ধান্ত নিয়েছেন জ্ঞানেশ কুমার। সেই বিতর্কের মধ্যেই মহারাষ্ট্রের সিইও-র তরফে ইসিআইনেট এবং ইআরও-দের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা বাড়ানোর প্রস্তাব সামনে আসায় গোটা বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
প্রসঙ্গত, ১৯৫০ সালের জনপ্রতিনিধিত্ব আইন এবং ১৯৬০ সালের ভোটার নিবন্ধন বিধি অনুযায়ী, বিধানসভা কেন্দ্রের ভোটার তালিকা প্রস্তুত ও সংশোধনের দায়িত্ব ইআরও-দের উপরই ন্যস্ত। ফলে সফটওয়্যারের মাধ্যমে তাঁদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের পরিসর কতটা থাকবে, এসআইআর-এর মতো সংবেদনশীল প্রক্রিয়ায় সেই প্রশ্নটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
















