এই আধুনিক যুগে দাঁড়িয়ে আমরা যখন মহাকাশ জয়ের স্বপ্ন দেখছি, তখনও পর্দার আড়ালে রয়ে গেছে এক বিশাল নীরবতা। সেই নীরবতা হল কর্মক্ষেত্রে টিকে থাকা অদৃশ্য লিঙ্গ বৈষম্য। সকলে সমান এই জয়গান গাইলেও, এখনও সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে বিশেষ করে কর্পোরেট সংস্কৃতির গভীরে লুকিয়ে আছে কিছু অদৃশ্য দেওয়াল। যা এখনও নারীদের সমান অধিকারের পথকে বন্ধ করে রেখেছে। এই লড়াইটা শুধু কর্মক্ষেত্রে নয়, বরং এটি মানসিকতার এক অদৃশ্য ভেদাভেদ। লিখলেন সুনন্দা সাহা।
সমান পদে অসম আয়
বেশিরভাগ কর্মক্ষেত্রে লিঙ্গ বৈষম্যের সবচেয়ে বেদনাদায়ক দিক হল জেন্ডার পে গ্যাপ। একই শিক্ষাগত যোগ্যতা, একই দক্ষতা এবং সমান দায়িত্ব পালনের পরেও নারীরা কম বেতন পেয়ে থাকে। এটি শুধুমাত্র অর্থনৈতিক ভেদাভেদ নয়, বরং এটি একজন নারীর শ্রম ও যোগ্যতার প্রতি অসম্মান জানানো। অনেক প্রতিষ্ঠানে নারীদের বেতন নির্ধারণ করা হয় তাদের পরিবার দেখে। যা মোটেও ন্যায্য নয়। যে কোনও প্রতিষ্ঠানেই ট্রান্সপারেন্ট স্যালারি স্ট্রাকচার বা স্বচ্ছ বেতন কাঠামো বাধ্যতামূলক করা বাঞ্ছনীয়। বেতন নির্ধারণের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত আলোচনা পরিবর্তে পদের নির্দিষ্ট স্কেল নির্ধারণ করে তা সবার জন্য উন্মুক্ত রাখা জরুরি। জেন্ডার অডিট করে বেতন বৈষম্য দূর করা প্রতিষ্ঠানের আইনি ও নৈতিক দায়িত্ব।
গ্লাস সিলিং : অদৃশ্য দেওয়াল
প্রতিষ্ঠানের একদম উচ্চ পদে নারীর উপস্থিতিকে ব্যতিক্রম হিসেবে ধরা হয়। এর কারণ হল ‘গ্লাস সিলিং’ বা অদৃশ্য দেওয়াল। এটি এমন এক সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক মানসিকতা, যেখানে যোগ্য থাকা সত্ত্বেও নারীদের পদোন্নতি বাধাগ্রস্ত হয়। এই দেয়ালটি ইটের তৈরি নয়। বরং এটি তৈরি দীর্ঘদিনের পুরুষতান্ত্রিক কাঠামো থেকে তৈরি। তাই উচ্চ পদে নারীদের কোটা নির্দিষ্ট শতাংশ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। পাশাপাশি, নারীদের জন্য বিভিন্ন প্রোগ্রাম চালু করতে হবে, যেখানে সিনিয়র লিডাররা নারীদের যোগ্যতাকে স্বীকৃতি দেবে।
মাতৃত্ব এবং কর্মজীবনের টানাপোড়েন মাতৃত্বকে নারী জীবনের পরম পাওয়া হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু কর্মক্ষেত্রে একে প্রায়শই নারীর কেরিয়ারের বাধা হিসেবে বিচার করা হয়। মাতৃত্বকালীন ছুটি শেষে কর্মক্ষেত্রে ফেরার পর অনেক নারীই লক্ষ্য করেন তাঁর কাজের ক্ষেত্র সংকুচিত হয়েছে। মাতৃত্ব ও কর্মজীবনের এই দ্বিমুখী টানাপোড়েনে অনেক নারীই তার কেরিয়ারে বিরতি দিতে বাধ্য হন। হয়তো ইচ্ছে করে নয় কিন্তু সময় বা পরিস্থিতির চাপে পড়ে এই সিদ্ধান্ত নেন তাঁরা। যা তাঁদের পেশাদার জীবনে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি বয়ে আনে। তবে মাতৃত্বকালীন ছুটিকে কেরিয়ারের বিরতি হিসেবে না দেখে একে একটি লাইফ স্টেজ হিসেবে গ্রহণ করা জরুরি। এছাড়া, কর্মস্থলে শিশু যত্ন কেন্দ্রের সুবিধা এবং মাতৃত্বকালীন ছুটির পর কর্মজীবনে সহজভাবে ফেরার জন্য।রি-অনবোর্ডিং পলিসি চালু করা প্রয়োজন।
মানসিকতার দেওয়াল ও সংস্কৃতির প্রভাব:- আমাদের সমাজে আজও অনেক ক্ষেত্রে নারীর মতামতকে প্রাধান্য দেওয়া হয় না। পারিবারিক সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ অনেক সময় সীমিত। একইভাবে, কর্মক্ষেত্রেও অনেক নারী নিজেদের মতামত প্রকাশে দ্বিধাবোধ করেন। কারণ সেখানে হয়তো পুরুষতান্ত্রিক নেতৃত্বের প্রভাব বিদ্যমান। কোনও বিষয়ে মেয়েরা যখন নিজের মতামত জানায় তখন তাদের গুরুত্ব দেওয়া হয় না। এই দ্বিচারিতা নারীর আত্মবিশ্বাসকে নষ্ট করে ফেলে। তাই কর্পোরেট সংস্কৃতিতে নারী নেতৃত্বকে বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া জরুরি। যাতে নারীরা নির্ভয়ে মতামত প্রকাশ করতে পারে। কিন্তু নেতৃত্ব মানেই যে জোর গলায় কথা বলা নয়, বরং সবার সম্মিলিত প্রয়াস এই সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠানে গেঁথে দিতে হবে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে নতুন লিঙ্গ বৈষম্য:-আমরা ভাবি প্রযুক্তি নিরপেক্ষ। কিন্তু এআই সিস্টেমও আমাদের সমাজ ও ইতিহাসের পক্ষপাত থেকে মুক্ত নয়। বড় বড় প্রতিষ্ঠান এখন রিক্রুটমেন্টের জন্য এআই ব্যবহার করছে। এই এআই মডেলগুলো তৈরি করা হয়েছে ঐতিহাসিক তথ্যের ভিত্তিতে। যেখানে বিগত দশকগুলোতে পুরুষরা বেশি উচ্চপদে আসীন ছিলেন। ফলে প্রযুক্তিও এখন নতুন করে লিঙ্গ বৈষম্যকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিচ্ছে। যা আরও সূক্ষ্ম ও ভয়াবহ। তাই বায়াস চেকিং বা পক্ষপাত যাচাই করা জরুরি। এটি এমনভাবে তৈরি করতে হবে যেখানে লিঙ্গ বৈষম্য নয়, বরং দক্ষতা ও মেধাকেই মূল প্রাধান্য দেওয়া উচিত।
হাইব্রিড ও রিমোট ওয়ার্ক:- আশীর্বাদ না নতুন ফাঁদ
হাইব্রিড বা রিমোট ওয়ার্ক মডেল আসার পর অনেকেই হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছিলেন। কিন্তু মুদ্রার উল্টো পিঠও আছে। ফলে যে নারীরা ঘরে থেকে কাজ করছেন, তাঁরা অনেক সময় অফিসের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের চোখের আড়ালে চলে যাচ্ছেন। উল্টোদিকে যাঁরা সশরীরে উপস্থিত হচ্ছেন তাঁরা দ্রুত পদোন্নতি পাচ্ছেন। ফলে ঘরে বসে কাজ করা যোগ্যরাও অনেক ক্ষেত্রে কেরিয়ার জগতে পিছিয়ে পড়ছেন। তাই হাইব্রিড ওয়ার্ক মডেলকে সফল করতে কাজের ফলের ভিত্তিতে মূল্যায়নের পদ্ধতি গ্রহণ করা দরকার। সশরীরে অফিসে উপস্থিতির চেয়েও কে কতটা কার্যকর অবদান রাখছে, তাতে গুরুত্ব দিতে হবে। অনলাইন মিটিংয়ে সবার সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে যাতে রিমোট কর্মীদের দৃশ্যমানতাও বজায় থাকে।
সেকেন্ড শিফট ও অদৃশ্য মানসিক শ্রম:-ছেলে-মেয়ে উভয়েই অফিসের কাজ শেষে ঘরে ফিরে আসে। কিন্তু নারীদের এই অফিস জগতের পরও শুরু হয় সাংসারিক জগৎ। কর্পোরেট ভাষায় যা সেকেন্ড শিফট। বাচ্চার স্কুলের রুটিন, বয়স্ক বাবা-মায়ের স্বাস্থ্য, সংসারের টুকিটাকি ব্যবস্থাপনা এই সবকিছুর মানসিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক চাপ। এই অদৃশ্য শ্রমের কোনও স্বীকৃতি নেই, কোনও পারিশ্রমিক নেই। এই দুই চাপের কারণে বহু প্রতিভাবান নারী কেরিয়ারের মধ্যপথে এসে ক্লান্ত হয়ে পড়েন। ফলে লড়াই থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিতে বাধ্য হন। তাই পুরুষদেরও সংসারের দায়িত্ব ও মানসিক শ্রম ভাগ করে নেওয়ার সংস্কৃতি তৈরি করতে হবে। যাতে নারীরাও কাজের পাশাপাশি সংসারের ভারসাম্য রক্ষা করতে পারেন।
লিঙ্গ বৈষম্য এখন আর চিৎকার করে করা কোনও অবিচার নয়। এটি সূক্ষ্ম একটি সুতোয় বোনা মাকড়সার জালের মতো। এই অদৃশ্য শৃঙ্খল ছিন্ন করতে থেকে কেবল ব্যক্তিগত লড়াই যথেষ্ট নয়। বরং প্রয়োজন মানসিকতা ও সিস্টেমের পরিবর্তন। নারীকে কেবল কাজের জায়গা দিতে হবে না, বরং এমন একটি পরিবেশ তৈরি করতে হবে যেখানে একজন নারী তার পূর্ণ রূপ নিয়ে বিকশিত হতে পারেন। যখন কোনও প্রতিষ্ঠান নারীর মাতৃত্ব বা পারিবারিক দায়িত্বকে বাধা না ভেবে জীবনের একটি অংশ হিসেবে মূল্যায়ন করবে, তখনই প্রকৃত অর্থে গ্লাস সিলিং ভাঙার সূচনা হবে। লড়াইটা কঠিন, কিন্তু অসম্ভব নয়। প্রতিটি সচেতন পদক্ষেপ আগামীর দিনগুলোকে আরও রঙিন করে তুলতে পারে।
















