একসময়ের ফরাসি উপনিবেশ চন্দননগরের গঙ্গার পাড়ে সেপ্টেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে নেমে আসতে চলেছে প্যারিসের আবহ। তিন দিনের বিশেষ উৎসবকে কেন্দ্র করে শহরের বিখ্যাত স্ট্র্যান্ড রোডকে আস্ত একটি প্যারিসের রাস্তার আদলে সাজিয়ে তোলার এক অভিনব পরিকল্পনা নিয়েছে রাজ্যের পর্যটন দফতর। আগামী ১১ থেকে ১৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলবে এই ‘চন্দননগর ফেস্টিভ্যাল’। এই উদ্যোগ সফল হলে আসন্ন বড়দিন ও বর্ষবরণ উপলক্ষেও এমন আয়োজনের পুনরাবৃত্তি হতে পারে বলে প্রশাসনিক সূত্রে জানা গিয়েছে।
পর্যটন দফতরের উদ্যোগে স্ট্র্যান্ডের এক বিস্তীর্ণ অংশ জুড়ে গড়ে তোলা হচ্ছে প্যারিসের রাস্তার পরিচিত পরিবেশ। থাকবে বিশেষ নকশার অস্থায়ী ইউরোপীয় স্থাপত্য, ক্যাফের আবহ এবং আন্তর্জাতিক মানের আলোকসজ্জা। চন্দননগরের ঐতিহ্যবাহী আলোকশিল্পকেই এই প্রকল্পের প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। নিখুঁত ভিজ্যুয়াল এফেক্ট ফুটিয়ে তুলতে স্থানীয় শিল্পীরা বিদেশ থেকে উন্নত প্রযুক্তির আলোকসজ্জার সরঞ্জাম আনিয়েছেন, যাতে দর্শনার্থীদের কাছে এই ‘প্যারিস স্ট্রিট’-এর অভিজ্ঞতা সম্পূর্ণ বাস্তবসম্মত হয়ে ওঠে।
রাজ্যের পর্যটন সচিব বরুণ রায় জানিয়েছেন, কেবল বাহ্যিক সাজসজ্জাই নয়, উৎসবের প্রতিটি পদক্ষেপে থাকবে ফরাসি ঐতিহ্যের স্পর্শ। স্ট্র্যান্ড সংলগ্ন এলাকায় ফরাসি ও অন্যান্য ইউরোপীয় খাবারের স্টলের পাশাপাশি রাখা হচ্ছে দেশীয় খাবারের ব্যবস্থাও। প্রতি সন্ধ্যায় বসবে সঙ্গীত ও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আসর। গঙ্গার ঘাটে আয়োজিত হবে বিশেষ গঙ্গা আরতি। উৎসবে ভারতের ফরাসি রাষ্ট্রদূত-সহ ফ্রান্সের একঝাঁক উচ্চপদস্থ প্রতিনিধির উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে। তাঁদের উপস্থিতিতে চন্দননগরের শতাব্দীপ্রাচীন ফরাসি ঐতিহ্যকে আন্তর্জাতিক পর্যটন মহলে নতুন করে তুলে ধরাই নবান্নের মূল লক্ষ্য।
এই উৎসবের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হতে চলেছে ঐতিহাসিকভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ফরাসি রেজিস্ট্রি ভবনের পুনরুজ্জীবন। দীর্ঘ সংস্কার পর্বের পর উৎসবের সূচনালগ্নে, অর্থাৎ ১১ সেপ্টেম্বর ভবনটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হবে। ১৬৭৩ সালে ফরাসি বাণিজ্যকেন্দ্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ এবং পরবর্তীকালে ১৯৫১ সালের ঐতিহাসিক ‘ট্রিটি অব সেশন’-এর মাধ্যমে ভারতের অঙ্গীভূত হওয়া— চন্দননগরের এই দীর্ঘ ফরাসি ইতিহাসের সুতো ধরেই পর্যটনের নতুন দিগন্ত খুলতে চাইছে প্রশাসন।
পর্যটন দফতর সূত্রে খবর, এটি কেবল একটি সাধারণ সাংস্কৃতিক উৎসব নয়, বরং বাংলায় আন্তর্জাতিক মানের থিম-ভিত্তিক নগর পর্যটন গড়ে তোলার পরীক্ষামূলক প্রয়াস। পাশাপাশি জলভিত্তিক পর্যটন সম্প্রসারণের অংশ হিসেবে চন্দননগর-সহ গঙ্গার তীরবর্তী এলাকাগুলিতে নতুন পরিকাঠামো গড়ার কাজ চলছে এবং নদীভিত্তিক পর্যটন নীতিও চূড়ান্ত পর্যায়ে। গঙ্গার প্রাকৃতিক রূপ, ঐতিহাসিক ঐতিহ্য এবং বিখ্যাত আলোকশিল্পের মেলবন্ধনে এই ফরাসি উৎসব আন্তর্জাতিক পর্যটন মানচিত্রে চন্দননগরকে এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দেবে বলেই মনে করছেন প্রশাসনিক কর্তারা।
















