উৎসবের মরশুমের ঠিক আগে উত্তরবঙ্গের প্রায় পাঁচ লক্ষ চা-শ্রমিকদের (Tea Garden worker) খুশির খবর দিল মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী (Chief Minister Suvendu Adhikari)। শুভেন্দু জানান অক্টোবরের মধ্যেই অর্থাৎ দুর্গাপুজোর আগেই তাঁদের হাতে বোনাসের টাকা (Bonus money) পোঁছে যাবে। শ্রম দফতরের নির্দেশিকায় স্পষ্ট করা হয়েছে, কোনও কর্মীর প্রকৃত বেতন নির্ধারিত সীমার বেশি হওয়ার কারণে যদি তিনি ১৯৬৫ সালের পেমেন্ট অফ বোনাস অ্যাক্টের এর আওতায় বোনাস পাওয়ার ক্ষেত্রে অযোগ্য হয়ে পড়েন, সেক্ষেত্রেও তাঁর বেতন নির্ধারিত সীমার মধ্যে রয়েছে বলে ধরে বোনাসের হিসাব করতে হবে। মাসিক বেতনভোগী কর্মীদের ক্ষেত্রেও গত বছরের মতো একই সিলিং লিমিট বজায় রাখার কথা বলা হয়েছে।
তবে সরকারি এই বোনাসের ঘোষণা ঘিরে শুরু হয়েছে নতুন বিতর্ক। কারণ, গত বছরও একইভাবে ২০ শতাংশ বোনাসের সুপারিশ করেছিল শ্রম দফতর। কিন্তু বহু চা-বাগানে সেই হারে বোনাস মেলেনি বলে অভিযোগ ওঠে। কোথাও কম হারে বোনাস দেওয়া হয়, কোথাও আবার দীর্ঘ টানাপোড়েনের পর সমঝোতার ভিত্তিতে নিষ্পত্তি হয়। ফলে এ বছরও সরকারি নির্দেশ কার্যকর হবে কি না, তা নিয়ে শ্রমিক মহলের একাংশের মধ্যে সংশয় থেকেই যাচ্ছে।
অন্যদিকে, রাজ্যের এই সিদ্ধান্তে অস্বস্তিতে পড়েছেন চা-বাগান মালিকদের একাংশ। তাঁদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরেই চা-শিল্প আর্থিক সঙ্কটের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা, নিলামে আশানুরূপ দাম না পাওয়া, উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি এবং শ্রম ব্যয়ের চাপ সব মিলিয়ে অধিকাংশ বাগানই কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছে। সেই অবস্থায় ২০ শতাংশ হারে বোনাস দেওয়া অনেক ক্ষেত্রেই বাস্তবসম্মত হবে না বলে তাঁদের আশঙ্কা।
শ্রমিক সংগঠনগুলির প্রতিক্রিয়াতেও ধরা পড়েছে ভিন্ন সুর। বামপন্থী সংগঠন ‘চিয়া কামান মজদুর ইউনিয়ন’-এর দার্জিলিং জেলার সাধারণ সম্পাদক গৌতম ঘোষের অভিযোগ, সরকার শুধু নির্দেশিকা জারি করেই দায়িত্ব শেষ করছে। গত বছরের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তাঁর বক্তব্য, বাস্তবে শ্রমিকরা শেষ পর্যন্ত ঘোষিত হারে বোনাস পাননি। তাই এ বছরও সরকারি ঘোষণার বাস্তবায়ন নিয়ে সন্দেহ থেকেই যাচ্ছে।
অন্যদিকে, কংগ্রেসের শ্রমিক সংগঠন আইএনটিইউসি সরকারি নির্দেশিকাকে স্বাগত জানিয়েছে। তবে তাদের দাবি, শুধু এ বছরের বোনাস নয়, গত বছরের যেসব বাগানে এখনও বকেয়া বোনাস পরিশোধ হয়নি, সেগুলিও দ্রুত মিটিয়ে দিতে হবে। একই সঙ্গে সরকারকে নির্দেশ কার্যকর করার ক্ষেত্রে কঠোর ভূমিকা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি।
বিজেপি সাংসদ মনোজ টিগ্গা অবশ্য রাজ্য সরকারের এই পদক্ষেপকে ইতিবাচক বলেই ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর মতে, দীর্ঘ ত্রিপাক্ষিক বা দ্বিপাক্ষিক আলোচনার পরিবর্তে সরাসরি অ্যাডভাইজরি জারি করায় অন্তত শ্রমিকদের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। তবে শেষ পর্যন্ত সমস্ত চা-বাগান এই সুপারিশ মেনে ২০ শতাংশ হারে বোনাস দেয় কি না, সেটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
উত্তরবঙ্গের চা-শিল্পে পুজো বোনাস প্রতি বছরই শ্রমিক ও মালিকপক্ষের টানাপোড়েনের অন্যতম ইস্যু। এ বারও সরকারি সুপারিশ সামনে আসার পর সেই বিতর্ক নতুন করে উসকে উঠেছে। ফলে ৫ অক্টোবরের মধ্যে কতগুলি বাগানে ২০ শতাংশ হারে বোনাস কার্যকর হয়, তার দিকেই এখন নজর শ্রমিক, মালিকপক্ষ এবং প্রশাসনের।
















