বিধানসভার ( WestBengal Assembly) বিশেষ অধিবেশনে প্রয়াত প্রাক্তন তৃণমূল বিধায়ক আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়কে ( Asish Bandyopadhyay) ঘিরে সরব হলেন শাসক ও বিরোধী শিবিরের একাধিক বিধায়ক। বৃহস্পতিবার অধিবেশনের শুরুতেই বিশিষ্ট ব্যক্তিদের প্রয়াণে শোকপ্রস্তাব পাঠ করেন অধ্যক্ষ ( Speaker) রথীন্দ্র বসু ( Rathindra Bose)। এরপর আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্মৃতিচারণায় বক্তব্য রাখেন বিভিন্ন দলের বিধায়করা। প্রয়াত নেতার রাজনৈতিক ভূমিকার পাশাপাশি তাঁর মৃত্যুকে ঘিরে তৈরি হওয়া নানা প্রশ্নও উঠে আসে আলোচনায়।
আরও পড়ুন: যাঁরা ছবি পুড়িয়েছে গ্রেফতার করুন: বাগেশ্বর বাবার সমর্থনে বিধানসভায় থেকে CP-কে নির্দেশ মুখ্যমন্ত্রীর
দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক পরিচিতির কথা উল্লেখ করে তৃণমূল বিধায়ক ( TMC MLA) শোভনদেব চট্টোপাধ্যায় (Sovandeb Chattopadhyay) জানান, আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের নিরাপত্তা নিয়ে মৃত্যুর আগে কোনও আশঙ্কার কথা তাঁর জানা ছিল না। সংবাদমাধ্যমে মৃত্যুর আগের দিন তাঁকে হুমকি দেওয়ার খবর প্রকাশ্যে এলেও, সেই দাবি সম্পর্কে তিনি নিশ্চিত নন বলে জানান। শোভনদেব বলেন, ‘'আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে দীর্ঘদিনের পরিচয় থাকা সত্ত্বেও তাঁর মৃত্যুর আগে পর্যন্ত এমন কোনও পরিস্থিতির কথা জানা ছিল না, যা থেকে তাঁর নিরাপত্তা নিয়ে আশঙ্কা তৈরি হতে পারে। মৃত্যুর একদিন আগে তাঁকে কেউ হুমকি দিয়েছিল বলে সংবাদমাধ্যম থেকে জানতে পাওয়া যাচ্ছে। তবে সেই দাবি বা হুমকির প্রকৃতি সম্পর্কে আমি নিজে নিশ্চিত নই।'’ তিনি আরও বলেন, ‘'আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক জীবন এবং তাঁকে ঘিরে বিভিন্ন বিতর্ক থাকলেও ব্যক্তিগতভাবে তাঁর বিরুদ্ধে কোনও অনৈতিক বা অপরাধমূলক আচরণের কথা আমার জানা ছিল না। তাঁর মৃত্যুকে ঘিরে যে প্রশ্নগুলি উঠেছে, সেগুলির নিরপেক্ষভাবে অনুসন্ধানের প্রয়োজন রয়েছে বলে আমি মনে করি।’'
এদিনের অধিবেশনে বিজেপি মন্ত্রী তাপস রায়ের বক্তব্যেও উঠে আসে আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্যক্তিগত ভাবমূর্তির প্রসঙ্গ। তাঁর দাবি, আগের সরকারের আমলের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও কর্মকাণ্ডের রাজনৈতিক দায়ভার বর্তমানে অনেকের উপর এসে পড়ছে। সেই প্রসঙ্গেই আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের মর্মান্তিক পরিণতি নিয়ে মন্তব্য করেন তিনি। তাপস রায় বলেন, "অত্যন্ত দুঃখের বিষয় হল, বিগত তৃণমূল সরকারের সময়ের একাধিক কাজের জন্য আজ অনেকেই অপরাধী হিসেবে গণ্য হচ্ছেন। আশিস বন্দ্যোপাধ্যায় একজন অত্যন্ত ভদ্র ও মার্জিত মানুষ ছিলেন। অথচ তৎকালীন কিছু অন্যায় ও অনভিপ্রেত ঘটনার দায়ভারের কারণে তাঁকে এরকম এক চরম ও নির্মম সিদ্ধান্ত নিতে হল! সেই আমলে এমন বহু কাজ হয়েছে যেখানে অন্যায় জড়িয়ে ছিল, যা আজ এই হাউসের প্রত্যেকের জন্যই অত্যন্ত শিক্ষণীয়।"
প্রয়াত নেতার কাজের ধরন ও দায়িত্ববোধের কথাও স্মরণ করেন ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে প্রথম সাক্ষাতের অভিজ্ঞতা। পাশাপাশি তাঁর দায়িত্বে থাকা কর্মীদের ভবিষ্যৎ নিয়েও তিনি কীভাবে চিন্তিত ছিলেন, সেই প্রসঙ্গও তুলে ধরেন ঋতব্রত। ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, "প্রথম দিন যখন তাঁর সঙ্গে দেখা হয়, তিনি প্রচুর বই নিয়ে এসেছিলেন এবং সেগুলি লাইব্রেরিতে ফেরত দিয়ে যান। পাশাপাশি তাঁর দায়িত্বে থাকা তিনজন ডেপুটি কর্মচারীর চাকরি যেন বহাল থাকে, সে বিষয়েও তিনি বিশেষ অনুরোধ করেছিলেন। তবে কোনও কোনও ক্ষেত্রে অন্যায় দেখলেও হয়তো পরিস্থিতিজনিত কারণে তিনি সোচ্চার প্রতিবাদ করে উঠতে পারেননি।"
আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে বিধানসভার প্রিভিলেজ কমিটিতে কাজ করার অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন বিজেপি বিধায়ক শংকর ঘোষও। তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে বিরোধীদের প্রশ্নের মুখে আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের অবস্থানের প্রসঙ্গ। শংকর ঘোষ বলেন, "প্রিভিলেজ কমিটির বৈঠকে আমি ও অশোক লাহিড়ী যখন বিভিন্ন বিরোধী কণ্ঠস্বর বা প্রশ্ন উত্থাপন করতাম, উনি অনেক সময় তা এড়িয়ে যেতেন। কারণ উনি জানতেন, সেই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে উত্তর দেওয়ার মতো পরিস্থিতি বা অবকাশ তাঁর কাছে ছিল না। তাঁর এই মর্মান্তিক পরিণতি রাজনৈতিক মহলে গভীর প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। মুখ্যমন্ত্রীও তাঁর বাসভবনে গিয়েছিলেন। ভবিষ্যতে যেন আর কোনও সহকর্মীকে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে না হয়, সে বিষয়ে আমাদের সকলকে সচেষ্ট হতে হবে।"
প্রসঙ্গত, ১৬ অগস্ট রামপুরহাটে বাড়ি সংলগ্ন দলীয় কার্যালয় থেকে আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের দেহ উদ্ধারের খবর প্রকাশ্যে আসে। ঘটনাকে ঘিরে দ্রুত রাজনৈতিক মহলে চাঞ্চল্য ছড়ায়। তাঁর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এবং তার আগে কী পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, তা নিয়ে শুরু হয় নানা আলোচনা ও প্রশ্ন। ঘটনার পর উদ্ধার হওয়া একটি চিঠি নিয়েও রাজনৈতিক মহলে আলোচনা শুরু হয়। পাশাপাশি তাঁর মৃত্যু এবং বীরভূমের বিভিন্ন দুর্নীতির অভিযোগের মধ্যে কোনও যোগসূত্র ছিল কিনা, তা নিয়েও রাজনৈতিক চাপানউতোর দেখা দেয়।
















