শাঁখের আওয়াজ আর কাঁসর-ঘণ্টার শব্দে গমগম করছে চারপাশ। বাতাসে ধূপ-ধুনোর গন্ধ। আর সেই চেনা চেনা সুরের তালে তাল মিলিয়ে মাথা দোলাচ্ছে ‘জেনিরা’, হিলারি, শিলাবতী, তিস্তা, বসন্ত, ভোলানাথ, মাধুরীরা। কোন মন্দিরে নয়, বিশ্বকর্মা পুজোর পুণ্যলগ্নে ডুয়ার্সের গরুমারা জাতীয় উদ্যানে এভাবেই সাড়ম্বরে চলল কুনকি হাতিদের বিশেষ আরাধনা।
আরও পড়ুন: আগের থেকে অর্ধেকের কম ধান কিনবে নয়া রাজ্য সরকার! চিন্তায় কৃষকরা
উত্তরবঙ্গের বনাঞ্চলের এক দীর্ঘকালীন ঐতিহ্য হল বিশ্বকর্মা পুজোয় কুনকি হাতিদের পুজো করা। বন দপ্তরের কাজে যে সমস্ত হাতিরা দিনরাত পরিশ্রম করে, তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাতেই প্রতি বছর এই বিশেষ দিনে হাতিদের দেবতাজ্ঞানে পুজো করা হয়। এবারও তার ব্যতিক্রম হল না। গরুমারা, জলদাপাড়া সহ বিভিন্ন পিলখানায় এই উৎসবকে কেন্দ্র করে এক উৎসবমুখর পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছিল।
আরও পড়ুন: হোমস্টে কর্তৃপক্ষই দায়ী! অভিযোগ তুললেন অগ্নিদগ্ধ তরুণীর স্বামীর
এদিনের পুজোর মূল আকর্ষণ ছিল হাতিদের রূপটান ও রাজকীয় ভোজ। পিলখানার মাহুত এবং প্যাটেলরা সাতসকালে নদী থেকে হাতিদের স্নান করিয়ে নিয়ে আসেন। এরপর তাদের গা ধুয়ে মুছে, কপালে ও পিঠে সিঁদুর ও চন্দনের আলপনা এঁকে সুন্দর করে সাজিয়ে তোলা হয়। গলা ও পায়ে পরানো হয় গাঁদা ফুলের মালা। পুজো শেষ হতেই শুরু হয় হাতিদের রসনাতৃপ্তির পালা। তাদের পাতে এদিন সাজিয়ে দেওয়া হয়েছিল রাজকীয় সব খাবার। মেনুতে ছিল চাল ও ডালের খিচুড়ি, থরে থরে সাজানো কলা গাছ, আনারস, আপেল, শশা, তরমুজ এবং হাতিদের অত্যন্ত প্রিয় গুড় ও আখের টুকরো। মন্ত্রোচ্চারণ এবং আরতির সময় হাতিদের শান্তভাবে দাঁড়িয়ে থেকে মাথা দোলাতে দেখে উপস্থিত পর্যটক ও বনকর্মীরা রীতিমতো আপ্লুত হয়ে পড়েন।
আরও পড়ুন: তৃতীয় সেমেস্টার পরীক্ষায় নয়া নির্দেশিকা সংসদের
প্রাণী ও বন রক্ষায় কুনকি হাতিরা বন দপ্তরের অন্যতম প্রধান শক্তি। পিঠে চেপে জঙ্গলে টহল দেওয়া থেকে শুরু করে রেসকিউ অপারেশন বা হাতি-মানুষের দ্বন্দ্বের মোকাবিলা করা—সব জায়গাতেই এই কুনকি হাতিরা অগ্রণী ভূমিকা নেয়। তাই বছরের এই একটা দিন মাহুত ও বনকর্মীরা তাদের ঘরের সদস্যের মতোই আদর-যত্নে ভরিয়ে দেন। প্রতি বছরের মতো এবারও গরুমারার এই হাতি পুজো দেখতে স্থানীয় মানুষজনের পাশাপাশি বহু পর্যটকের ভিড় জমেছিল। পুজোর এই আনন্দঘন মুহূর্ত ক্যামেরাবন্দি করতে ভোলেননি অনেকেই। সব মিলিয়ে, শাঁখ ও কাঁসর-ঘণ্টার সুরে প্রকৃতির কোলে হাতিদের এই আরাধনা আরও একবার প্রমাণ করল মানুষ এবং বন্যপ্রাণের এক অদ্ভুত ও সুন্দর মেলবন্ধনকে।
















